...|...|...

খেলা

দারিদ্র্য থেকে বিশ্বসেরা, রোনালদোর অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ নভেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:০৭ | আপডেট: ৬ নভেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:১৬
Shares
দারিদ্র্য থেকে বিশ্বসেরা, রোনালদোর অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প

ছবি: সংগৃহীত

দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে বেড়ে ওঠা এক শিশুর বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা হয়ে ওঠার গল্প ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ছোটবেলায় যার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ছিল সীমিত, সেই রোনালদোই আজ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড়। গোল, শিরোপা, ব্যক্তিগত পুরস্কার ও অসংখ্য রেকর্ডে সমৃদ্ধ তার দীর্ঘ ক্যারিয়ার। ৪১ বছর বয়সেও মাঠে সক্রিয় এই পর্তুগিজ তারকার নামের পাশে রয়েছে এমন সব অর্জন, যা তাকে ফুটবলের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে দিয়েছে।

১৯৮৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপপুঞ্জের ফুনশাল শহরের সাও পেদ্রো প্যারিশে জন্মগ্রহণ করেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তার বাবা ছিলেন মালী এবং মা কাজ করতেন রাঁধুনি হিসেবে। সীমিত সামর্থ্যের পরিবারে বেড়ে ওঠা রোনালদোর ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। মাত্র তিন বছর বয়সে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় তার। আট বছর বয়সে স্থানীয় অপেশাদার ক্লাব আন্দোরিনহার হয়ে ফুটবল খেলা শুরু করেন তিনি। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ক্লাবটির বয়সভিত্তিক দলে খেলেন এই ফুটবলার।

অল্প বয়সেই রোনালদোর প্রতিভার খবর ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯৫ সালে মাদেইরার দুই পরিচিত ক্লাব সিএস মারিতিমো ও সিডি নাশিওনাল তাকে দলে নেওয়ার আগ্রহ দেখায়। তবে আন্দোরিনহার কর্মকর্তাদের সাথে নির্ধারিত বৈঠকে মারিতিমোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত হতে না পারায় নাশিওনালের হয়ে খেলার সুযোগ পান তিনি। সেখানে দুই বছর কাটান রোনালদো। এই সময় একটি মৌসুমে শিরোপাও জেতেন।

এরপর আসে তার ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ১৯৯৭ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে পর্তুগালের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব স্পোর্টিং সিপির হয়ে তিন দিনের ট্রায়ালে অংশ নেন রোনালদো। তার ফুটবলীয় দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে ১ হাজার ৫০০ পাউন্ডের বিনিময়ে তাকে দলে নেয় ক্লাবটি। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণে এরপর জন্মস্থান মাদেইরা ছেড়ে লিসবনে চলে যান তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় বড় মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই।

ক্লাব ফুটবলে উত্থান

পেশাদার ফুটবলে রোনালদোর যাত্রা শুরু স্পোর্টিং সিপির হয়ে। সেখানে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেওয়ার পর ২০০৩ সালে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেন তিনি। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অধীনে ধীরে ধীরে নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে প্রথম মেয়াদেই ব্যালন ডি’অর জেতেন রোনালদো। এরপর ২০০৯ সালে রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে যোগ দেন স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদে। ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় কাটান এই ক্লাবেই। রিয়ালের হয়ে একের পর এক গোল ও শিরোপা জিতে গড়েন নতুন ইতিহাস। এরপর ইতালির জুভেন্টাসে খেলেছেন। পরে আবারও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ফিরে আসেন। বর্তমানে সৌদি আরবের ক্লাব আল-নাসরের হয়ে খেলছেন এই পর্তুগিজ তারকা।

জাতীয় দলের হয়ে সাফল্য

ক্লাব ফুটবলের মতো পর্তুগালের জাতীয় দলেও রোনালদোর অর্জন অসাধারণ। দীর্ঘদিন দলের নেতৃত্ব দেওয়া এই তারকার সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০১৬ সালে। তার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে পর্তুগাল। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপাও জেতে দলটি।

জাতীয় দলের হয়ে এখন পর্যন্ত ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন রোনালদো। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও তার দখলে। দীর্ঘ সময় ধরে পর্তুগালের আক্রমণভাগের প্রধান ভরসা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

ব্যক্তিগত অর্জন ও রেকর্ড

ব্যক্তিগত সাফল্যের তালিকায় রোনালদোর অর্জন বেশ দীর্ঘ। পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জয়ের পাশাপাশি চারবার ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট পেয়েছেন তিনি। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৩৪টির বেশি বড় শিরোপা জিতেছেন এই ফুটবলার। এর মধ্যে সাতটি লিগ শিরোপা, পাঁচটি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ, একটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও দুটি নেশনস লিগের ট্রফি উল্লেখযোগ্য।

ইউরোপের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব প্রতিযোগিতা চ্যাম্পিয়নস লিগে ১৪০ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড ধরে রেখেছেন রোনালদো। পেশাদার ফুটবলে ১ হাজার ২০০টির বেশি ম্যাচ খেলা বিরল কয়েকজন খেলোয়াড়ের একজন এই পর্তুগিজ তারকা।

বিশ্বকাপের মঞ্চেও রয়েছে তার অনন্য কীর্তি। আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির সাথে যৌথভাবে ছয়টি বিশ্বকাপ আসরে অংশ নেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। একই সাথে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপ আসরে গোল করার কীর্তিও রয়েছে তার। তবে এতসব অর্জনের পরও বিশ্বকাপের শিরোপা জেতা হয়নি রোনালদোর।

ক্যারিয়ারের সামগ্রিক পরিসংখ্যান

দীর্ঘ পেশাদার ক্যারিয়ারে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ১ হাজার ৩৪৩টির বেশি ম্যাচ খেলেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। গোলসংখ্যা ৯৮৫ ছাড়িয়েছে। সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়েছেন ২৯১টির বেশি। বয়স বাড়লেও গোল করার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন তিনি। এখন তার সামনে বড় ব্যক্তিগত লক্ষ্য ক্যারিয়ারের গোলসংখ্যাকে চার অঙ্কে নিয়ে যাওয়া।

শৈশবে মাদেইরার ছোট্ট শহর থেকে শুরু হয়েছিল যে স্বপ্নের যাত্রা, তা আজ বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম বড় অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। গোল, শিরোপা, রেকর্ড আর দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতা সব মিলিয়ে রোনালদোর ক্যারিয়ার কেবল একজন ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়, বরং প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার এক অনন্য উদাহরণ।