কোনো বন্দরে না থেমে টানা রেকর্ড ২৫০ দিন সমুদ্রে থাকার পর থাইল্যান্ডের পাতায়ার কাছে নোঙর করেছে পারমাণবিক শক্তিচালিত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দীর্ঘ সময় সমুদ্রে দায়িত্ব পালনের পর জাহাজটি প্রায় ৫ হাজার নাবিক নিয়ে নোঙর করে।
বিবিসি জানিয়েছে, পাতায়ার সমুদ্রতীরবর্তী রিসোর্টের কাছে নোঙর করা রণতরীটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আগ্রহ। কোলাহলপূর্ণ রাতের জীবন ও যৌন পর্যটনের জন্য পরিচিত পাতায়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য এই শহরে আসতেন। তাদের আগমনের পরই একসময়কার ঘুমন্ত জেলেপল্লি ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠে ব্যস্ত পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে।
তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে পর্যটন ও ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ায় পাতায়ার অনেক ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়েছে। ফলে দীর্ঘদিন সমুদ্রে থাকা মার্কিন নাবিকদের আগমনকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছেন। নয় মাস সমুদ্রে কাটানোর সময় জমে থাকা বেতন থেকে নাবিকেরা এখানে অর্থ ব্যয় করবেন—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে তাদের।
ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো থেকে প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরে ছয় মাসের নির্ধারিত দায়িত্বে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করলে রণতরীটিকে পারস্য উপসাগরের দিকে পাঠানো হয়।
দীর্ঘ এই দায়িত্ব নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য। নাবিকদের মধ্যে খাদ্যসংকট, ভাঙা শৌচাগার এবং মানসিক চাপের খবর নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন নৌবাহিনী স্বীকার করেছে, কাজের পরিবেশ কঠিন ছিল; তবে নাবিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা।
এদিকে থাইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিভিত্তিক মিত্র হওয়ায় দেশটিতে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজের আগমন নতুন কিছু নয়। তবে ১৯৭৫ সালে সাইগনের পতনের পর এই প্রথম এত বিপুলসংখ্যক মার্কিন সামরিক কর্মী সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পাতায়ায় আসছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও তাই নাবিকদের আগমনকে স্বাগত জানিয়েছেন। ওয়াকিং স্ট্রিটের কাছে রত্নের দোকান চালানো আনন সাইতির বলেন, এই সফর স্থানীয় ব্যবসার জন্য বড় সুযোগ হতে পারে। মার্কিন নাবিক ও মেরিনদের স্বাগত জানিয়ে তার দোকানে বিশেষ ছাড়ের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
তবে পাতায়ায় অবস্থানের সময় মার্কিন সামরিক সদস্যদের চলাফেরায় কিছু বিধিনিষেধ থাকছে। থাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়েকটি এলাকায় তাদের প্রবেশের অনুমতি থাকবে না। এর মধ্যে রয়েছে সোই ৬, যা উত্তেজক গো-গো বারগুলোর জন্য পরিচিত। থাই পুলিশ মার্কিন সামরিক সদস্যদের মনে করিয়ে দিয়েছে, দেশটিতে পতিতাবৃত্তি আইনত অবৈধ।
এ ছাড়া পাতায়ার বিভিন্ন গাঁজার দোকানেও মার্কিন ক্রু সদস্যদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্যারাগ্লাইডিং ও জেট-স্কির মতো কিছু সামুদ্রিক খেলাধুলাও তাদের জন্য নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনী প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত বন্দর থেকে পাতায়ায় যাতায়াতের জন্য শাটল বাসের ব্যবস্থা করেছে। তীরে রাত কাটাতে আগ্রহী নাবিকদের জন্য দুটি হোটেলও নির্ধারণ করা হয়েছে।
মার্কিন সামরিক সদস্যদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে থাই কর্তৃপক্ষ শহরের বিনোদন এলাকাগুলোতে শত শত পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্কিন অতিথিদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য না নেওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
পাতায়ার মেয়র পোরামাসে এনগাম্পিচেস বলেন, কয়েক দশক আগে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের সফরের ফলেই পাতায়া বিশ্বের কাছে পরিচিতি পায় এবং পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়। তবে শহরের পুরোনো ভাবমূর্তির পাশাপাশি খেলাধুলা, সেমিনার, সুস্থতা ও পরিবারবান্ধব নানা আয়োজনের মাধ্যমে পাতায়া এখন বদলে গেছে বলেও জানান তিনি।
উভয় দেশই আশা করছে, আগামী ৬ সেপ্টেম্বর ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে দীর্ঘ স্বদেশযাত্রা শুরু করার আগে এর নাবিকেরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও মানসিক স্বস্তি পাবেন।


