...|...|...

বিশ্ব

তিন বছরের ইসরায়েলি হামলায় গাজায় মহামানবিক বিপর্যয়

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:১৮
Shares
তিন বছরের ইসরায়েলি হামলায় গাজায় মহামানবিক বিপর্যয়

ছবি: সংগৃহীত

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে তিন বছর ধরে চলা ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনের গাজার চেহারা পুরো বদলে গেছে। ধারাবাহিক বিমান ও স্থল হামলায় ধ্বংস হয়েছে বাড়িঘর, পাড়া-মহল্লা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ভেঙে পড়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনীতির বড় অংশ।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সংবাদমাধ্যম আল-জজিরা এক প্রতিবেদনে জানায়, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ৭৪ হাজার ২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবনও বারবার বাস্তুচ্যুতি ও স্থানান্তরের আদেশে বিপর্যস্ত হয়েছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করা হলেও দুর্ভোগ পুরোপুরি থামেনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ১ হাজার ৪৬২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজাজুড়ে ইসরায়েলি হামলা ও অন্যান্য সামরিক কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

বদলে গেছে দৈনন্দিন জীবন

যুদ্ধ গাজার মানুষের শুধু বসবাসের জায়গাই কেড়ে নেয়নি, বদলে দিয়েছে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সবকিছু। ঘরবাড়ি, চলমান পানি, বিদ্যুৎ ও যানবাহনের মতো মৌলিক সুবিধা এখন অনেকের জন্যই অনুপস্থিত।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষ জরুরি আশ্রয় ও মৌলিক গৃহস্থালি সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে ছিলেন। ৬৫ শতাংশ পরিবার তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছিল। অনেক পরিবারের পর্যাপ্ত বিছানাপত্র, আলো, রান্নার সরঞ্জাম ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থাও নেই।

পানির সংকটও তীব্র। আগস্টের শুরুতে মূল্যায়ন করা পরিবারগুলোর ৯১ শতাংশ মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার পানি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। জুনে এই হার ছিল ৮৪ শতাংশ।

বিদ্যুৎ সরবরাহও অনির্ভরযোগ্য। কার্যকর বিদ্যুৎ গ্রিড না থাকায় জরুরি সেবা ও পরিবারগুলোকে জেনারেটর এবং সীমিত জ্বালানি, ইঞ্জিন অয়েল ও যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ধ্বংস অর্থনীতিও

দীর্ঘ যুদ্ধ গাজার অর্থনীতিকে প্রায় অচল করে দিয়েছে। ব্যবসা ও স্থানীয় শিল্প ধ্বংস হওয়ায় আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বেকারত্বের হার পৌঁছেছে ৭৮ শতাংশে।

২০২৫ সালে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন ছিল মাত্র ২১২ ডলার, যা ২০২২ সালের প্রায় ১৭ শতাংশ। কৃষি ও শিল্প খাত ২০২২ সালের উৎপাদনের মাত্র ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। নির্মাণ খাতের উৎপাদন নেমেছে মাত্র ১ শতাংশে।

এর প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে পণ্যের দাম ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ২০০ শতাংশ বেশি ছিল।

চাকরি ও আয় কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার এখন মানবিক সহায়তা, ঋণ ও ছোট পরিসরের অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল। অনেক পরিবার নগদ সহায়তাও নিচ্ছে। তবে নগদ অর্থের সংকট বাড়ায় ডিজিটাল লেনদেন ও ই-ওয়ালেটের ব্যবহারও বেড়েছে।

তিন বছর ধরে বন্ধ শিক্ষার পথ

যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি পড়েছে শিশুদের শিক্ষায়। প্রায় তিন বছর ধরে লাখো শিশু নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না। অনেক স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। টিকে থাকা অনেক স্কুল আবার আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৭ লাখ শিশু টানা প্রায় তিন বছর সশরীরে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

অনেক শিশু এখন তাঁবু ও অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা করছে। প্রায় ২ লাখ শিশু কোনো ধরনের শিক্ষার সুযোগই পাচ্ছে না। ফিলিস্তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় মৌলিক দক্ষতার গুরুতর ক্ষতি ও ক্রমবর্ধমান শিক্ষাগত ব্যবধান নিয়ে সতর্ক করেছে।

ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা

গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও মারাত্মক সংকটে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, গাজার ৩৬টি হাসপাতালের সবকটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে ১৯টি হাসপাতাল চালু থাকলেও কোনোটিই পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না।

চালু থাকা হাসপাতালগুলোতে জরুরি ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, রোগ নির্ণয়ের উপকরণ ও জ্বালানির সংকট রয়েছে। ফলে ক্যানসার চিকিৎসা, ডায়ালাইসিসসহ দীর্ঘস্থায়ী রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় ১২ হাজার ৪০০ রোগীকে চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আরও হাজারো রোগীর এমন বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন, যা গাজার ভেতরে পাওয়া সম্ভব নয়।

অপর্যাপ্ত আশ্রয়, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র পুনর্বাসন, জরুরি ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ এবং আরও বেশি রোগীকে চিকিৎসার জন্য বাইরে নেওয়ার সুযোগ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।

সংকুচিত হচ্ছে বসবাসের জায়গা

যুদ্ধের কারণে গাজার ভৌগোলিক অবস্থাও বদলে গেছে। ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলের বিধিনিষেধে অঞ্চলটি খণ্ডিত হয়ে পড়েছে। ফলে ফিলিস্তিনিরা ক্রমেই ছোট একটি এলাকায় বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।

‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত একটি সামরিক সীমানা রেখা ইসরায়েলি বাহিনীর অবস্থান ও চলাচল-নিয়ন্ত্রিত এলাকা চিহ্নিত করছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির আওতায় রেখাটি নির্ধারণের পর এটি জনবসতিপূর্ণ এলাকার আরও গভীরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর’-এর গত সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলের বিধিনিষেধ গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকায় বিস্তৃত। ফলে ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি উপত্যকার ৩০ শতাংশেরও কম এলাকায় গাদাগাদি করে বসবাস করছেন।

রাফাহ এর বড় উদাহরণ। যুদ্ধের সময় গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে ১০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাসে রাফাহতে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে ৮ লাখের বেশি মানুষ আবারও বাস্তুচ্যুত হন।

দুর্বল হয়ে পড়েছে প্রশাসন ও নিরাপত্তা

যুদ্ধের আগে ২০০৭ সাল থেকে হামাস গাজার বেসামরিক প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিচালনা করে আসছিল। যুদ্ধের ফলে সেই কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

জুলাইয়ে হামাস ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’র কাছে প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দেয়। যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গঠিত ফিলিস্তিনি বিশেষজ্ঞদের এই কমিটির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি।

একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাও সংকটে পড়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে পুলিশের ওপর অন্তত ১২টি হামলায় ৩৫ পুলিশ সদস্যসহ মোট ৫৩ জন নিহত হয়েছেন।

জাতিসংঘ বলছে, জনশাসন ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ফলে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দুর্বল হয়েছে। ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনও সতর্ক করেছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় অপহরণ, সম্পত্তিতে হামলা ও মানবিক সহায়তা লুটের মতো ঘটনা বাড়ছে।

তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধ তাই গাজার মানুষের জীবনকে শুধু ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেনি; কেড়ে নিয়েছে নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ। অনিশ্চয়তা আর সংকটের মধ্যেই ভবিষ্যতের কোনো স্পষ্ট পথ খুঁজে বেড়াচ্ছেন গাজার লাখো মানুষ।