...|...|...

রাজধানী

ঢামেকের মর্গে প্রেমিকের লাশ দেখার কয়েক ঘণ্টা পর না ফেরার দেশে নার্স

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৬:৫৯ | আপডেট: ৬ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৮:২৬
Shares
ঢামেকের মর্গে প্রেমিকের লাশ দেখার কয়েক ঘণ্টা পর না ফেরার দেশে নার্স

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে প্রেমিক আকাশ মিত্রের লাশ দেখতে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নার্স তন্ময়ী মণ্ডলের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) সকালে হাসপাতালের পুরোনো ভবনের নিচতলার একটি টয়লেট থেকে তার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

প্রাথমিকভাবে তন্ময়ী আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। তবে এটি হত্যা কি না কিংবা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী তা নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ঘটনার সূত্রপাত রবিবার (৪ অক্টোবর) বিকেলে। কেরানীগঞ্জের বাসা থেকে আকাশ মিত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢামেক হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়। আকাশের সাথে তন্ময়ীর সম্পর্ক ছিল। প্রেমিকের ময়নাতদন্তের সময় মর্গে উপস্থিত ছিলেন তন্ময়ীও। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সেখানে আকাশের লাশ দেখার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি।

পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, এরপর হাসপাতালের ভেতরেই কোনো একসময় নিজেকে আহত করেন তন্ময়ী। পরে পুরোনো ভবনের নিচতলার একটি টয়লেটে যান। সেখান থেকেই তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

তন্ময়ীর বোন তন্দ্রা মণ্ডল জানান, কেরানীগঞ্জের আকাশের সাথে তার বোনের সম্পর্ক ছিল। তার দাবি, বিভিন্ন অজুহাতে আকাশ তন্ময়ীর কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নিয়েছিলেন। ওই টাকা তন্ময়ী কয়েকজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে তাকে দিয়েছিলেন।

আকাশের মৃত্যুর বিষয়েও পুলিশের কাছে একটি চিঠির তথ্য রয়েছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই রফিকুল ইসলাম জানান, আর্থিক সংকট ও ঋণের কারণে আকাশ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। মৃত্যুর আগে লেখা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, পৃথিবী ছেড়ে যেতে চান না, কিন্তু তার কাছে টাকা নেই। তন্ময়ী তার কাছে টাকা পাবেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ ছিল। একই চিঠিতে তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন বলেও লেখা ছিল।

সোমবার সকাল ১০টার দিকে ঢামেকের পুরোনো ভবনের ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝামাঝি নারীদের টয়লেটের ৪ নম্বর কক্ষ থেকে তন্ময়ীর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাহমুদ শেখ কক্ষটি পরিষ্কার করতে গিয়ে কয়েকবার দরজায় ধাক্কা দিলেও কোনো সাড়া পাননি। পরে আরও দুই কর্মীকে নিয়ে দরজা খুললে তন্ময়ীকে রক্তাক্ত ও ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তারা। বিষয়টি পরে আনসার সদস্য ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।

তবে এর কয়েক ঘণ্টা আগে হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের সম্মেলন কক্ষের একটি গেটের সামনে রক্তাক্ত একটি কালো স্টিলের ফল কাটার ছুরি পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাশী পেল্লী সন্তোষ সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ছুরিটি দেখতে পান। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে তিনি জায়গাটি পরিষ্কার করেন এবং ছুরিটি নিজের কাছে রাখেন। পরে তন্ময়ীর মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. শায়লা ফেরদৌস আহসান জানান, সম্মেলন কক্ষের দ্বিতীয় গেটের বাইরে রক্তের দাগও দেখা গিয়েছিল। ওই এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। ফুটেজ পর্যালোচনা করলে ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানান তিনি।

তন্ময়ী মণ্ডল বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার মৃত বিভূতি মণ্ডলের মেয়ে। তিনি শাহবাগের ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং প্রায় এক মাস আগে সেখানে যোগ দেন।

ঘটনার পর প্রথমদিকে তন্ময়ীর মৃত্যু নিয়ে হত্যার সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ শুরু করে। পরে পরিবার ও প্রাথমিক তদন্ত থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আত্মহত্যার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে তখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ঘটনাটির পেছনে গভীর কোনো রহস্য থাকতে পারে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট আলামত সংগ্রহ করেছে। তন্ময়ীর ব্যাগ থেকে তার নাম লেখা একটি চিরকুটও পাওয়া গেছে।

সর্বশেষ পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে তন্ময়ীর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, চিরকুট, ঘটনাস্থলের আলামত এবং পরিবারের বক্তব্য মিলিয়ে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আকাশের মৃত্যু, তন্ময়ীর সাথে তার সম্পর্ক ও আর্থিক লেনদেনসহ পুরো ঘটনাপ্রবাহও তদন্তের আওতায় রয়েছে।