পরিবারের ভাঙাচোরা ঘরটি ঠিক করার স্বপ্ন ছিল মেহেদী হাসানের। সেই স্বপ্ন পূরণে আরও কিছু টাকা জমাতে নির্মাণশ্রমিকের কাজে যোগ দিতে গত সোমবার রাতে নীলফামারীর ডোমারের বাড়ি থেকে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। কিন্তু ঢাকায় আসার পরদিনই বারিধারায় ফুটপাতে বসে থাকা অবস্থায় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট কারের চাপায় প্রাণ হারান ২৫ বছরের এই তরুণ।
মো. মেহেদী হাসান ওরফে মীম নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের হাজীপাড়া গ্রামের দিনমজুর মো. এরশাদুল হকের ছেলে। তিনি বাক্প্রতিবন্ধী ছিলেন। ইশারায় কথা বললেও পরিবারের জন্য কিছু করার চেষ্টা ছিল তার। পড়াশোনার পাশাপাশি নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন। অবসর সময়ে কাগজের ফুল তৈরি করে বিভিন্ন গ্রামীণ মেলা ও দোকানে বিক্রি করতেন।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বারিধারা এলাকায় একটি মসজিদে নামাজ আদায় করে ফুটপাতে বসেছিলেন মেহেদী। এ সময় একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
মেহেদীর মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর বুধবার দুপুরে ডোমারের হাজীপাড়া গ্রামের বাড়িতে নেমে আসে শোকের আবহ। স্বজন ও প্রতিবেশীরা বাড়িতে ভিড় করেন। দুপুর ১২টার দিকে লাশবাহী গাড়িতে তার লাশ বাড়িতে পৌঁছায়। বাড়ির সামনে মশারির নিচে লাশ রাখা হলে স্বজনেরা শেষবারের মতো তাকে দেখেন। পরে বেলা তিনটায় বাড়ির অদূরে হাজীপাড়া কবরস্থানে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।
মেহেদীর মা মোছা. মিনু বেগম আহাজারি করতে করতে বলেন, অনেক আশা নিয়া গেইছে আমার বাবা বাড়ি থাকি। এর আগে একবার যাবার চাইছে, আমি যাবার দেই নাই। কইছি অনেক রোদ গরম, দুই মাস পর যাইস, একটু ঠান্ডা আসুক। বাবা কইছিল ঠিক আছে, মা।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মেহেদী ডোমার সরকারি কলেজের বিএ (পাস) দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। বড় ভাই ও ছোট বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা-মায়ের সাথেই থাকতেন তিনি।
পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে পড়াশোনার পাশাপাশি নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন মেহেদী। কাগজের ফুল বানিয়েও আয় করতেন। এর আগে ঢাকায় গিয়ে প্রতি মাসে নিজের খরচ বাদ দিয়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা করে বাড়িতে পাঠাতেন।
মেহেদীর মা জানান, বাড়িঘর সংস্কারের জন্যই এবার ঢাকায় গিয়েছিলেন তার ছেলে। যাওয়ার সময় বলেছিলেন, ঈদের আগে টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরবেন এবং সেই টাকা দিয়ে ঘর ঠিক করবেন। কিন্তু ঢাকায় যাওয়ার এক দিনের মাথায় লাশ হয়ে বাড়িতে ফিরতে হলো তাকে।
মেহেদীর বাবা এরশাদুল হক বলেন, সোমবার রাতে আমি নিজে তাকে ঢাকার গাড়িতে তুলে দিলাম। আজকে তার লাশ আসল, এটা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। এভাবে আমার বাবাকে হারাব জানলে তাকে ঢাকায় যেতে দিতাম না। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেল।
মেহেদীর ফুফাতো ভাই ও একই গ্রামের বাসিন্দা সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী জানান, তাদের পরিবারের মূল সম্বল ১০ শতক জমির ভিটা। বাবার দিনমজুরি এবং মেহেদীর আয়ে সংসার চলত। মাঝেমধ্যে নির্মাণশ্রমিকের কাজে ঢাকায় যেতেন মেহেদী। এবারও গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাতে ঢাকায় যান। পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে বারিধারার একটি মসজিদে নামাজ আদায় করে ফুটপাতে বসে থাকার সময় প্রাইভেট কারটি তাকে চাপা দেয়।
সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ছেলেটি বাক্প্রতিবন্ধী হওয়ায় ইশারায় কথা বলত। গ্রামের সবাই তাকে ভালোবাসতেন। তার মধ্যে অনেক প্রতিভা ছিল। কিন্তু অকালে সব ঝরে গেল।
সোনারায় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গোলাম ফিরোজ চৌধুরী বলেন, মেহেদী হাসান লেখাপড়ার পাশাপাশি পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করত। সে একজন বাক্প্রতিবন্ধী হলেও তার মধ্যে অনেক প্রতিভা ছিল। একটি দুর্ঘটনায় পরিবারটির সব স্বপ্ন নিমেষে শেষ হয়ে গেল।
এদিকে দুর্ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন গাড়ির চালকের আসনে থাকা এক কিশোরকে আটক করেন। পরে পুলিশ তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়। এ ঘটনায় করা মামলায় ওই কিশোরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। মামলায় গাড়িটির চালক হিসেবে আকাশ মারক (৪৪) নামের এক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, দুর্ঘটনার সময় গাড়িটি আসলে কে চালাচ্ছিল এবং চালকের আসনে থাকা কিশোরকে আটক করার পরও কেন মামলায় তার নাম উল্লেখ করা হয়নি।
গুলশান থানা-পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ওই কিশোর ঢাকার গুলশান এলাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী। তার বাবা আব্বাস আলী শরীফ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ক্যাপ্টেন। দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেট কারটি তার মায়ের নামে নিবন্ধিত।
গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইসমাইল হোসেন বলেন, নিহত মেহেদীর বড় ভাই গাড়িটির চালক আকাশ মারকের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। ওই কিশোরের নাম মামলায় উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাকে গ্রেফতার করা হবে।



