‘এবারের মিশন শেষ করে দেশে ফিরে পাকা ঘর করবে। বাসায় ওয়াই-ফাই লাগাবে, এলইডি টেলিভিশন কিনবে। হয়তো সবই আসবে, সবই হবে- শুধু আসবে না আমার ছোট ছেলে ট্রোম্যান খীসা।’
ছেলের বলা কথা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা স্বপ্নের কথা মনে করে এভাবেই বিলাপ করছিলেন রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের দুর্গম রামহরি পাড়ার বাসিন্দা গঙ্গাদেবী খীসা। চোখের সামনে সন্তানের ছবি, আর বুকভরা কান্না- ছেলেকে হারানোর শোক যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্তব্যরত অবস্থায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ট্রোম্যান খীসার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো পরিবার ও এলাকায়। গত ২০ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব পালনকালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিনি মারা যান।
পরিবারের সদস্যরা জানান, চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শান্তিরক্ষা মিশন শেষে দেশে ফেরার কথা ছিল ট্রোম্যানের। দেশে ফিরে পরিবারের জন্য পাকা ঘর নির্মাণ, বাড়িতে ওয়াই-ফাই সংযোগ ও একটি এলইডি টেলিভিশন কেনাসহ নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবায়ন করা হলো না। ডিসেম্বর মাসে তিনি ফিরবেন ঠিকই, তবে প্রিয়জনের সাথে হাসিমুখে নয়- ফিরবেন কফিনবন্দি নিথর দেহে।
ট্রোম্যান খীসার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা গঙ্গাদেবী খীসা। কখনো ছেলের ছবির দিকে তাকিয়ে নির্বাক হয়ে যাচ্ছেন, আবার কখনো বিলাপ করে বলছেন, ছেলে দেশে ফিরে পরিবারের কষ্ট দূর করবে- এমন আশাতেই দিন গুনছিলেন তিনি। এখন সেই অপেক্ষা পরিণত হয়েছে শোক আর দীর্ঘশ্বাসে।
গঙ্গাদেবী খীসা বলেন, আমার ছেলে বলেছিল, মিশন শেষ করে দেশে এসে আমাদের জন্য পাকা ঘর করবে। বাসায় ওয়াই-ফাই লাগাবে, টেলিভিশন কিনবে। কত স্বপ্ন ছিল তার। এখন ঘর হবে, টেলিভিশন আসবে, অনেক কিছুই হয়তো হবে; কিন্তু আমার ছেলে আর আসবে না। আমি আমার ছেলেকে ফিরে চাই।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন ট্রোম্যান খীসা। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিতে দক্ষিণ সুদানে যান তিনি। দায়িত্ব পালন শেষে চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার কথা ছিল তার। পরিবারের সদস্যরাও সেই দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার মাঝেই আসে মর্মান্তিক মৃত্যুসংবাদ।
ট্রোম্যানের বাবা সুবিমল খীসা বলেন, পরিবারের প্রধান আর্থিক ভরসা ছিলেন তার ছেলে। প্রতি মাসে পরিবারের বাজার-খরচসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর জন্য অগ্রিম টাকা পাঠাতেন ট্রোম্যান। পরিবারের সদস্যদের সচ্ছল রাখতে নিজের উপার্জনের বড় একটা অংশ ব্যয় করতেন তিনি।
তিনি বলেন, আমার ছেলে আমাদের পরিবারের সব খরচ বহন করত। প্রতি মাসে বাজারের খরচও অগ্রিম দিয়ে দিত। সংসারটা ও-ই চালিয়ে রাখত। এখন হঠাৎ করে সেই পথটাও বন্ধ হয়ে গেল। আমরা ছেলেকে হারিয়েছি, পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার জায়গাটাও হারিয়েছি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, আমার ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। অন্তত তার স্ত্রীকে একটি সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে পরিবারটি কোনোভাবে দাঁড়াতে পারবে। ছেলের পরিবারের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সরকার যেন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
স্বজনরা জানান, ট্রোম্যান ছিলেন পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী একজন মানুষ। নিজের কর্মজীবনের পাশাপাশি পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও তার ছিল নানা পরিকল্পনা। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ছোট্ট ঘর থেকে স্বপ্ন দেখেছিলেন পরিবারের জীবনকে একটু সচ্ছল করার। শান্তিরক্ষা মিশনে গিয়ে নিজের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সেই স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরাও। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে সবকিছু।
এখন রামহরি পাড়ার বাড়িটিতে ছেলের ফেরার অপেক্ষা নেই, আছে কফিন আসার প্রতীক্ষা। যে মা ছেলেকে জীবিত অবস্থায় ঘরে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন, সেই মাকেই এখন অপেক্ষা করতে হচ্ছে সন্তানের নিথর দেহের জন্য।
ট্রোম্যানের স্বজন ও এলাকাবাসী বলছেন, দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিদেশের মাটিতে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। তার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।
একদিকে প্রিয় সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা- দুই দিক থেকেই কঠিন সময় পার করছে ট্রোম্যান খীসার পরিবার। তাই শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখার অপেক্ষায় যেমন স্বজনদের চোখে জল, তেমনি ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
মায়ের কণ্ঠে বারবার ফিরে আসছে সেই কথাই- ‘সবই আসবে, সবই হবে; শুধু আসবে না আমার ছোট ছেলে ট্রোম্যান।’
ছেলের রেখে যাওয়া স্বপ্নগুলো হয়তো একদিন পূরণ হবে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মানুষটি আর কখনো ফিরে আসবেন না।



