চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক দেড় বছর পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় বিএনপি। প্রায় দুই দশক পর আবার ক্ষমতায় আসা দলটির সরকার সম্প্রতি ছয় মাস পূর্তি করেছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পরদিনই তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে তিনটি অগ্রাধিকার ঠিক করে সরকার- দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। এই ছয় মাসে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে বেশ কিছু ইতিবাচক দিক উঠে এসেছে।
কূটনৈতিক অর্জন
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে। চলতি বছরের ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির এই বিষয়ে বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই জয়লাভকে বর্তমান সরকারের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে গণ্য করা যায়।
ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া ও চীনে, যা অনুষ্ঠিত হয় ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত। সফরকালে তিনি প্রথমে মালয়েশিয়া যান, এরপর সেখান থেকে চীনে যান। এই সফরে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও রোহিঙ্গা সংকট সমাধান নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয় বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর প্রস্তাব, এবং চীনের সঙ্গে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ সমঝোতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরকেও একটি সফলতা হিসেবে দেখা যায়—চীনের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব আসা এবং তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষায় চীনাদের অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতিকে তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অন্যতম সফলতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে উদ্যোগ
সামাজিক উন্নয়ন খাতেও বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার, যার মধ্যে অন্যতম ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই উদ্যোগগুলো সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে এবং সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এক ধরনের সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছে।
এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগ লক্ষণীয়। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে হাঁটছে, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে। আগে মার্জ করা পাঁচটি ব্যাংককে পুনরায় কার্যকর করার প্রচেষ্টাকেও তিনি একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে চিহ্নিত করেন।
রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচনে উদ্যোগ
সরকার গঠনের পর সরকার ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রীয় খরচ কমাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেশ কিছু উদ্যোগ সাধারণ মানুষের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে নেওয়া এসব পদক্ষেপ সরকারের স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার একটি ইতিবাচক নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে জনমনে।
অর্থনৈতিক খাতে সংস্কারের প্রচেষ্টা
দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল যথেষ্ট ভঙ্গুর- উচ্চ সরকারি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত ও বিনিয়োগ সংকট শুরু থেকেই সরকারের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছিল। এমন প্রেক্ষাপটেও সরকার বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানা পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভাবে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, আর সরকারের এই তহবিল গঠনের উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে কারখানা পুনরায় চালুর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, স্বল্প সময়ের মধ্যেই ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে পূর্ণ উত্তরণ প্রত্যাশা করা না গেলেও, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে সরকারের অগ্রসর হওয়ার প্রবণতাকে তিনি একটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এই ছয় মাসের সার্বিক অর্জন প্রসঙ্গে বিবিসি বাংলাকে বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি যেসব অঙ্গীকার করেছিল, তা এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, গত ছয় মাসে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অধিকাংশই পূর্ণ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘে গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচন, চীনের সঙ্গে ব্যাপক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার প্রচেষ্টা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচনে দৃশ্যমান উদ্যোগ- এই ক্ষেত্রগুলোতে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসের অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

