রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পাশের দেয়ালে ১০ জন লেখক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ছবি আঁকা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের গুণীজনদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের তিন ব্যক্তিত্বের ছবি স্থান পেয়েছে। তবে দেশের আরও অনেক পরিচিত লেখক, শিল্পী ও নারী ব্যক্তিত্বের ছবি না থাকায় প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
সম্প্রতি রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এর অংশ হিসেবে শিল্পকলা একাডেমির সীমানাপ্রাচীরের উল্টো পাশে ফুটপাত সাজানো হয়। সেখানে নতুন ডাস্টবিন ও বসার বেঞ্চ স্থাপনের পাশাপাশি দেয়ালে আঁকা হয় ১০ জন গুণী ব্যক্তিত্বের ছবি। গত সোমবার সকালে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম।
দেয়ালে স্থান পাওয়া ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ফকির লালন শাহ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম ও অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদি। এ ছাড়া কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঔপন্যাসিক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ছবিও আঁকা হয়েছে।
তবে এই তালিকায় বাংলাদেশের আরও অনেক পরিচিত ব্যক্তিত্বের নাম না থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করছেন অনেকে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ব্যক্তিত্বদের ছবি স্থান পেলেও দেশের নারী শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের কেন রাখা হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
লেখক ও চিন্তক ব্রাত্য রাইসু ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে দেয়ালচিত্রের ব্যক্তিত্ব নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, জায়গা সীমিত হলে কাদের ছবি রাখা হবে, তা নির্ধারণে তুলনামূলক গুরুত্ব বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। তিনি লেখক হুমায়ূন আহমেদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, সংগীতশিল্পী আজম খান ও চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানের মতো ব্যক্তিত্বদের ছবি না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন।
ব্রাত্য রাইসু আরও প্রশ্ন তোলেন, দেশের গুণীজনদের ছবি রাখার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার না দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ব্যক্তিত্বদের অন্তর্ভুক্ত করার কারণ কী। তার অভিযোগ, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলা সংস্কৃতিকে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যায়। তিনি বিষয়টিকে সাংস্কৃতিক রাজনীতির অংশ হিসেবেও উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রেস সচিব ও ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলমও দেয়ালচিত্রের ব্যক্তিত্ব নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বলেন, ছবিগুলোর তালিকায় নারী ব্যক্তিত্বদের অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সেখানে ভাস্কর নভেরা আহমেদ, অভিনেত্রী ববিতা ও নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার মতো ব্যক্তিত্বদের রাখা যেত।
শফিকুল আলমের মতে, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনার দাবি রাখে।
তিনি বলেন, সত্যজিৎ রায় ও বিদ্যাসাগর দুজনই তার পছন্দের ব্যক্তিত্ব। তবে তাদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সাথে পশ্চিমবঙ্গের পরিচয়কে এক করে দেখানোর প্রবণতা তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, কলকাতা সিটি করপোরেশন একই ধরনের উদ্যোগ নিলে সেখানে বাংলাদেশের লেখক, চলচ্চিত্রকার ও সংগীতশিল্পীদের ছবি রাখা হতো কি না। তার মতে, দুই দেশের ভাষা ও সংস্কৃতিতে মিল থাকলেও রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পরিচয় আলাদা। তাই বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত চলচ্চিত্রকারদের নিয়ে কোনো দেয়ালচিত্র তৈরি করা হলে সেখানে সত্যজিৎ রায়সহ বিভিন্ন দেশের নির্মাতাদের ছবি রাখা স্বাভাবিক। কিন্তু শুধু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি ব্যক্তিত্বদের বাংলাদেশের গুণীজনদের সাথে যুক্ত করার বিষয়টি ভিন্ন প্রশ্ন তৈরি করে।
শিল্পকলা একাডেমির পাশের দেয়ালে আঁকা ছবি নিয়ে বিতর্কের মূল বিষয় হয়ে উঠেছে ব্যক্তিত্ব নির্বাচনের ভিত্তি, বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্ব এবং নারী ব্যক্তিত্বদের অনুপস্থিতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।


