...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

সাভারের ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ এলাকা

চোখ রাঙাচ্ছে ইট পোড়ানোর আসন্ন মৌসুম

এনায়েত শাওন
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৯:১১ | আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৯:১২
Shares
চোখ রাঙাচ্ছে ইট পোড়ানোর আসন্ন মৌসুম

ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবছরের নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত শুষ্ক আবহাওয়ার  সময়কে সারাদেশে ইট পোড়ানোর মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সে প্রেক্ষিতে সাভারের অবৈধ ইটভাটা চোখ রাঙাচ্ছে বায়ু দূষণ রোধে সরকারের ঘোষিত ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণাকে। ইটভাটার মালিকরা যেমন প্রস্তুতি নিচ্ছে তেমনি অবৈধভাবে ইট পোড়ানোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছে পরিবেশ অধিদফতরও।

জানা গেছে, রাজধানী ঢাকায় বায়ুদূষণের পরিমাণ কমাতে গত বছর সাভার উপজেলাকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করে সরকার। পরিপত্র অনুযায়ী, ডিগ্রেডেড এয়ারশেড ঘোষিত এলাকায় ইট পোড়ানো ও ইট প্রস্তুতের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। কিন্তু পরিবেশবান্ধব উপায়ে ইট পোড়ানোর অনুমতি প্রাপ্ত গুটিকয়েক ভাটা ব্যাতীত শতাধিক ইটভাটা পরিবেশ অধিদফতরের জন্য গলার কাঁটা হয়ে উঠতে পারে। গত বছরের মতো চলতি বছরেরও যদি ইটভাটা মালিকেরা উচ্চ আদালতের রিটের উছিলায় এবারও ইট পোড়ানোর কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। সাভারের ডিগ্রেডেড এয়ারশেড এলাকা কি শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে কিনা সে বিষয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

নথিপত্র মতে, পরিবেশ অধিদফতরের সার্বক্ষণিক বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্রগুলোর তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে সাভারের বায়ুর বার্ষিক মানমাত্রা জাতীয় বার্ষিক নির্ধারিত মানমাত্রার প্রায় তিন গুণ অতিক্রম করেছে। জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় সাভার উপজেলা মারাত্মক বায়ুদূষণযুক্ত এলাকায় পরিণত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৫ মাস উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমে বায়ু প্রবাহিত হয়। ফলে সাভার উপজেলায় সৃষ্ট বায়ুদূষণ ঢাকা শহরে প্রবেশ করে। এটি ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের তীব্রতা অনেক বাড়িয়ে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২-এর ক্ষমতাবলে ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট সরকার ঢাকা জেলার অন্তর্গত শিল্পঘন সাভার উপজেলাকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করে। পরিপত্র অনুযায়ী, ডিগ্রেডেড এয়ারশেড-ঘোষিত এলাকায় সব ধরনের ইটভাটায় ইট পোড়ানো ও ইট প্রস্তুতের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়, সাভার উপজেলার অন্তর্গত টানেল ও হাইব্রিড হফম্যান কিলন পদ্ধতির ইটভাটা বাকিগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধের কথা বলা হয়েছে। অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী সাভার উপজেলায় ডিগ্রেডেড এয়ারশেড এলাকা ঘোষণার পূর্বে ১০৬টি ইটভাটা ছিল। এর মধ্যে মাত্র ৪টি ইটভাটায় পরিবেশবান্ধব উপায়ে ইট তৈরি করা হতো। তবে, উপজেলা প্রশাসনের বক্তব্য জানতে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি। তবে উপজেলা সূত্র জানিয়েছে, ডিগ্রেডেড এয়ারশেড এলাকা ঘোষণার পর থেকেই কিছু ইটভাটা বন্ধ হয়ে যায়, কিছু অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও খসড়া হিসাব অনুযায়ী অর্ধশতাধিক ভাটা গত মৌসুমে চলমান ছিল বলে জানায়।

সূত্র জানায়, যদিও চারটি ইটভাটা ব্যাতীত বাকি সকল ইটভাটা অবৈধ হয়ে গেছে কেননা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোনো ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। এই পরিবেশবান্ধব চারটি ছাড়াও অবৈধ ইটভাটাও প্রস্তুতি নিচ্ছে মৌসুমের জন্য। গত বছরের মৌসুমের শুরুতে এই পরিপত্র জারি করায় অনেক ইটভাটা উচ্চ আদালতের রিট করে ইট পুড়িয়েছে। এবারও অনেকে উচ্চ আদালতে রিটকে উছিলা হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

এসম্পর্কে এবিসি ব্রিকসের মালিক জিন্নত মিয়া টাইমস টুডেকে বলেন, দুই মাস পর থেকে ইট পোড়ানো শুরু হবে, সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।

পরিবেশবান্ধব উপায়ে এবিসি ব্রিকস ইট পোড়ায় না তবে কিভাবে ভাটা চালু করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে জিন্নত বলেন, যেভাবে পোড়ানোর ব্যবস্থা করতে হয় তাই করব। কাগজ করা আছে।

যদিও এখন ইট পোড়ানোর মৌসুম নয় তবু সাভারের ভাকুর্তা ও শিমুলিয়ার উচু এলাকাতে কয়েকটি ইটভাটা এখনো চালু রয়েছে। সাভারের অন্যান্য নিচু এলাকা তুরাগের পানিতে ডুবে থাকায় ইটভাটা মালিকেরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইট পোড়ানোর। এমনকি ঋণে ডুবে থাকা ভাটাগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ধর্না দেওয়াও হতে পারে। এছাড়া ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক ইটভাটা মালিক পরিবেশ অধিদফতরের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অধিদফতরের এনফোর্সমেন্টের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা ও পরিবেশ সংগঠনের নেতারা।

এ প্রসঙ্গে রনি ব্রিকসের কাওসার আহমেদ বলেন, ঋণ করেছে অনেক ভাটা মালিক। একজন তো গতবছর আত্মহত্যাও করেছে। ভাটা মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

জানা গেছে, সাভারকে ডিগ্রেডেড এয়ারশেড এলাকা ঘোষণার পর তা বাস্তবায়নের জন্য একটি কমিটিও করা হয়েছে পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে। আসন্ন মৌসুমে অধিদফতরের করণীয় সম্পর্কে জানতে গত সপ্তাহে এই বাস্তবায়ন কমিটির পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ের কাছে মতামত চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে পরিবেশ অধিদফতরের ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালক ও বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব মো. ইলিয়াস মাহমুদ টাইমস টুডেকে বলেন, পরিপত্র জারির পর সমস্ত চারটি ব্যাতীত বাকিগুলো অবৈধ হয়ে গেছে। ডিগ্রেডেড এয়ারশেড এলাকা হিসেবে বাস্তবায়ন করতে যা করণীয় তাই করা হবে।

জানা গেছে, গত বছর পরিপত্র জারির পর সাভারের ইটভাটা বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযান চালিয়ে ইটভাটা ভেঙে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পরেও অনেকে আবার মেরামত করে ভাটার কার্যক্রম চালু রাখে। এমনকি ইটভাটার কার্যক্রম চালু রাখতে উচ্চ আদালতে রিট করে আইনী জটিলতা সৃষ্টিও করে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে পরিবেশ অধিদফতরের ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক মো. ফেরদৌস আনোয়ার টাইমস টুডেকে বলেন, এখন তো ইট পোড়ানোর মৌসুম নয় তাই কোনো ভাটা চালু থাকার সম্ভবনা নেই। উচ্চ আদালতের মাধ্যমে আইনী জটিলতা গত মৌসুমে হয়েছিল। তবে অভিযান চালু ছিল, এবারও যা যা করা দরকার তাই করা হবে।