দেশের চা উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের চা বাগানগুলোতে চলছে এক নীরব সংকট। অভাব, দারিদ্র্য ও অসচেতনতার কারণে অনেক শিশু স্কুলের বই-খাতা ছেড়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ছে। কীটনাশক স্প্রে, চা পাতা বহন, আগাছা পরিষ্কার ও বাগান পরিচর্যার মতো কাজ এখন তাদের নিত্যদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া ও কালীঘাট এবং কমলগঞ্জের মিতৃংঙ্গা ও পাত্রখোলা চা বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৮টা থেকে বিকেল পর্যন্ত অনেক শিশু বাবা-মায়ের সাথে কাজ করছে। কারও বয়স ১০, কারও ১২ বছর। কারও হাতে কীটনাশক ছিটানোর পাম্প মেশিন, আবার কারও মাথায় চা পাতার ঝুড়ি।
কীভাবে শিশুরা জড়াচ্ছে
বাগান শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এখনও ১৭০ টাকা। একজনের আয়ে ৫-৬ সদস্যের সংসার চালানো কঠিন। তাই বাধ্য হয়ে শ্রমিক বাবা-মায়েরা সন্তানদের সাথে নিয়ে কাজে আসেন। প্রথমে খেলার ছলে কাজে আসা, পরে অভ্যাস এবং একসময় পরিবারের বাড়তি উপার্জনের মাধ্যম হয়ে ওঠে শিশুরা।
৯ বছরের রতন জানায়, স্কুলে যাই না। মায়ের সাথে পাতা তুললে দিনে দুই ঝুড়ি তুললে ৫০ টাকা দেয়।
১০ বছরের সুমিকে কীটনাশক স্প্রে করতে দেখা যায়। তার গায়ে কোনো নিরাপত্তা পোশাক ছিল না।
বাগান ব্যবস্থাপনা কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা নিষেধ করি। কিন্তু শ্রমিকরা বলে, ছেলে-মেয়ে না আনলে সংসার চলবে কিভাবে? আবার অনেকে বাচ্চাদের দিয়ে হালকা কাজ করিয়ে নেয়।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বড় ঝুঁকি
চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের জন্য কীটনাশকের সংস্পর্শ সবচেয়ে বিপজ্জনক। এতে শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগসহ দীর্ঘমেয়াদে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ভারী ঝুড়ি বহনের কারণে শিশুদের কোমর ও হাড়ের গঠনেও সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষায়। চা বাগান এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ঝরে পড়ার হার বেশি। পঞ্চম শ্রেণি পাস করার আগেই অনেক শিশু কাজে জড়িয়ে পড়ে। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই দারিদ্র্যের চক্রে আটকে যাচ্ছে।
সংসদে উঠেছে বিষয়টি
এই ভয়াবহ চিত্র নিয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে কথা বলেছেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
তিনি বলেন, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের চা বাগানগুলোতে শিশু শ্রম এখনও বন্ধ হয়নি। অভাব ও অসচেতনতার কারণে শিশুরা কীটনাশক স্প্রে, পাতা বহন ও বাগান পরিচর্যার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছে। এটি মানবাধিকারের লঙ্ঘন। একইসাথে তারা শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান, চা বাগানগুলোতে শিশু শ্রম বন্ধে কঠোর মনিটরিং, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং বাগান এলাকায় মানসম্মত স্কুল ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
আইন কী বলছে
শিশু শ্রম নিরসন আইন ২০১৩ অনুযায়ী, ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কাজে নিয়োগ দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু চা বাগান এলাকায় এই আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। স্থানীয় প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না।
সমাধানের পথ কী
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।
১. মজুরি বৃদ্ধি: শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা গেলে সন্তানদের কাজে পাঠানোর প্রয়োজন কমবে।
২. শিক্ষা নিশ্চিতকরণ: চা বাগান এলাকায় মানসম্মত স্কুল, উপবৃত্তি এবং ঝরে পড়া রোধে বিশেষ প্রকল্প চালু করা প্রয়োজন।
৩. সচেতনতা: শ্রমিক ও মালিকপক্ষকে শিশু শ্রমের কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
৪. বিকল্প আয়: বাগানের নারীদের জন্য সেলাই, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
চা শ্রমিক নেতা বিজয় হাজরা বলেন, আমরা চাই না আমাদের সন্তানরা আমাদের মতোই সারাজীবন কষ্ট করুক। সরকার যদি পাশে দাঁড়ায়, তাহলে আমরাও বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাব।
চায়ের কাপে যে সুগন্ধ, তার পেছনে লুকিয়ে আছে শত শত শিশুর ঘাম ও কান্না। চা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে আগে এই শিশুদের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে হবে। তা না হলে একদিন বাগানে চা পাতা তোলার মতো কেউ থাকবে না, কারণ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রজন্মই হবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি।


