অনেকের সকাল শুরুই হয় এক কাপ চা বা কফি দিয়ে। কেউ বলেন, চা বা কফি না খেলে মাথা কাজ করে না। আবার কারও ধারণা, দিনের প্রথম কাপ কফি না পাওয়া পর্যন্ত মনোযোগ বা কাজের গতি ঠিক আসে না। তবে বাস্তবতা হলো, চা বা কফি মস্তিষ্কের জন্য অপরিহার্য কোনো খাবার নয়। ক্যাফেইন সাময়িকভাবে সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়াতে পারে, কিন্তু এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোর জন্য আবশ্যক নয়।
চা ও কফির প্রধান সক্রিয় উপাদান ক্যাফেইন। এটি মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন নামের একটি রাসায়নিকের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। অ্যাডেনোসিন শরীরে ঘুমঘুম ভাব তৈরি করতে ভূমিকা রাখে। ক্যাফেইন এই প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ায় অনেকের সাময়িকভাবে বেশি সতর্ক, সজাগ ও মনোযোগী মনে হয়। সাধারণত ক্যাফেইন গ্রহণের কিছু সময়ের মধ্যেই এই প্রভাব শুরু হতে পারে।
তবে এই প্রভাব স্থায়ী নয়। নিয়মিত চা বা কফি পান করলে শরীর ক্যাফেইনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে। ফলে একই মাত্রার ক্যাফেইন আগের মতো শক্তিশালী অনুভূতি নাও দিতে পারে। এ কারণেই অনেক নিয়মিত কফি বা চা পানকারী মনে করেন, পানীয়টি ছাড়া তাদের মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ করছে না। অনেক ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কের ক্যাফেইন-নির্ভর হয়ে যাওয়ার চেয়ে অভ্যাস, ঘুমের ঘাটতি এবং ক্যাফেইন-সহনশীলতার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।
একটি সুস্থ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য ক্যাফেইন গ্রহণ প্রয়োজন হয় না। মস্তিষ্কের শক্তির প্রধান উৎস হলো গ্লুকোজ। তবে শুধু গ্লুকোজ থাকলেই মস্তিষ্ক ভালো থাকবে এমনটিও নয়। পর্যাপ্ত ঘুম, পানি পান, সুষম খাদ্য, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ সবকিছুই মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ঘুমের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম না নিয়ে বারবার চা বা কফির মাধ্যমে ক্লান্তি ঢাকার চেষ্টা করলে মূল সমস্যার সমাধান হয় না। ক্যাফেইন সাময়িকভাবে ঘুমঘুম ভাব কমাতে পারে, কিন্তু ঘুমের ঘাটতি পূরণ করতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে ভালো মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুমের বিকল্প নেই।
ক্যাফেইন শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল সাময়িকভাবে বাড়াতে পারে। তবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে পরিমিত ক্যাফেইন গ্রহণের কারণে দীর্ঘমেয়াদে কর্টিসল সবসময় অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকে এমন প্রমাণ নেই। তাই এক কাপ চা বা কফি খেলেই শরীরে দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস তৈরি হবে এমন ধারণাও সঠিক নয়। তবে ব্যক্তিভেদে ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা আলাদা। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণে অস্থিরতা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, উদ্বেগ বা ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
চায়ের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। চায়ে ক্যাফেইনের পাশাপাশি L-theanine নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, L-theanine শিথিলতা বজায় রেখে মনোযোগে সহায়তা করতে পারে। এ কারণে অনেকের কাছে চা পান করার অভিজ্ঞতা কফির তুলনায় তুলনামূলকভাবে শান্ত ও মনোযোগ-কেন্দ্রিক মনে হতে পারে।
মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য অবশ্য শুধু চা বা কফির ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। মাছ, বাদাম, বীজসহ বিভিন্ন খাবার থেকে পাওয়া ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং পর্যাপ্ত প্রোটিন সমৃদ্ধ সুষম খাদ্য সামগ্রিক মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চা বা কফি কখন পান করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাদের আয়রনের ঘাটতির ঝুঁকি রয়েছে, তাদের খাবারের সঙ্গে চা বা কফি পান না করাই ভালো। চা ও কফিতে থাকা কিছু যৌগ খাবার থেকে নন-হিম আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে। তাই খাবারের সঙ্গে বা খাবারের ঠিক পরপর চা-কফি পান করার পরিবর্তে কিছুটা সময়ের ব্যবধান রাখা উপকারী হতে পারে। ব্যক্তির আয়রনের অবস্থা ও খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী এই ব্যবধান নির্ধারণ করা যেতে পারে।
তাহলে কি চা বা কফি খাওয়া খারাপ? মোটেও নয়। পরিমিত পরিমাণে চা বা কফি অনেক সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। ক্যাফেইন সাময়িকভাবে সতর্কতা, মনোযোগ এবং কর্মক্ষমতার অনুভূতি বাড়াতে পারে। কিন্তু এটিকে মস্তিষ্কের জন্য অপরিহার্য জ্বালানি হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
বরং কেউ যদি মনে করেন, চা বা কফি না খেলে আমি একদম কাজ করতে পারি না, তাহলে নিজের জীবনযাপনের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে কি না, পানি যথেষ্ট পান করা হচ্ছে কি না, খাবার নিয়মিত ও সুষম কি না, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করা হচ্ছে কি না এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
চা বা কফি কর্মক্ষমতা বাড়াতে পারে, কিন্তু মস্তিষ্ক চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় নয়। একটি সুস্থ মস্তিষ্কের ভিত্তি হলো পর্যাপ্ত ঘুম, সঠিক পুষ্টি, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। ক্যাফেইন সেই ভিত্তির ওপর একটি সাময়িক সহায়ক হতে পারে, ভিত্তির বিকল্প নয়।
চা বা কফি ছাড়া মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয় না। যদি প্রতিদিনের কাজ শুরু করতে ক্যাফেইনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে হয়, তাহলে শুধু আরেক কাপ চা বা কফি নয় নিজের ঘুম, খাদ্যাভ্যাস, পানি পান এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
রাইসা মেহজাবীন
ফিটনেস পুষ্টিবিদ
বিএসসি (অনার্স), ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ডিইউ
এমপিএইচ (চলমান), পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
পিজিটি (Nutrition and Fitness Training), ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার
স্পেশালাইজড ইন ফিটনেস নিউট্রিশন ট্রেনিং, নিউট্রিশন সলিউশনস
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও ফিটনেস কোচ, ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার, ধানমন্ডি ব্রাঞ্চ
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ

