ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে হঠাৎ মনে হলো, যেন কোথাও থেকে পড়ে যাচ্ছেন! সাথে সাথে শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল, কখনো হাত-পা নড়ে উঠল, আবার কখনো বুক ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে গেল। এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়।
কেউ মনে করেন, এটি হয়তো কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণ। আবার কেউ মনে করেন, ঘুমের মধ্যে সত্যিই শরীর ভারসাম্য হারানোর মতো কোনো সংকেত পাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর পেছনে রয়েছে ঘুম ও জাগরণের মধ্যবর্তী সময়ে মস্তিষ্ক ও শরীরে ঘটে যাওয়া একটি স্বাভাবিক পরিবর্তন।
এই ঘটনাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় হিপনিক জার্ক (Hypnic jerk) বা স্লিপ স্টার্ট (Sleep start)।
হিপনিক জার্ক আসলে কী?
হিপনিক জার্ক হলো ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে শরীরের কোনো পেশি বা একাধিক পেশিতে হঠাৎ, অনিচ্ছাকৃত ও খুব দ্রুত সংকোচন হওয়া।
এ সময় কারও শুধু হাত বা পা ঝাঁকুনি দিতে পারে, আবার কারও পুরো শরীরই একবার কেঁপে উঠতে পারে। অনেকের সাথে থাকে হঠাৎ পড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি।
কখনো এর সাথে মনে হতে পারে-
- সিঁড়ি থেকে পড়ে যাচ্ছেন।
- বিছানা থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছেন।
- হঠাৎ শূন্যে ভেসে যাচ্ছেন।
- শরীর যেন এক ঝটকায় নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঝাঁকুনির সাথে হঠাৎ আলো ঝলকানোর মতো অনুভূতি, শব্দ শোনা বা স্বপ্নের মতো কোনো দৃশ্যও দেখা যেতে পারে।
তাহলে পড়ে যাচ্ছি মনে হয় কেন?
এর সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবে বিজ্ঞানীদের কয়েকটি ব্যাখ্যা রয়েছে।
ঘুমিয়ে পড়ার সময় মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে জাগ্রত অবস্থা থেকে ঘুমের অবস্থায় প্রবেশ করে। একইসাথে শরীরের পেশিগুলোও ধীরে ধীরে শিথিল হতে শুরু করে। ঘুমের প্রথম ধাপকে NREM Stage 1 বলা হয়, যেখানে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ, হৃদ্স্পন্দন ও নড়াচড়া ধীরে ধীরে কমে আসে। এই পর্যায়েই হিপনিক জার্ক দেখা দিতে পারে।
একটি প্রচলিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অনুযায়ী, পেশি দ্রুত শিথিল হওয়ার সময় মস্তিষ্কের কোনো অংশ সাময়িকভাবে এই পরিবর্তনকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে- যেন শরীর ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে বা পড়ে যাচ্ছে। তখন মস্তিষ্ক থেকে পেশিতে হঠাৎ সংকেত যায় এবং শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে।
অর্থাৎ, আপনি বাস্তবে পড়ে যাচ্ছেন না; বরং ঘুমে প্রবেশের সময় মস্তিষ্ক ও শরীরের সমন্বয়ে তৈরি হওয়া একটি অনুভূতি থেকেই পড়ে যাওয়ার মতো মনে হতে পারে।
তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে, এই ব্যাখ্যাটি একটি তত্ত্ব; হিপনিক জার্কের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
কেন কারও কারও বেশি হয়?
হিপনিক জার্ক যেকোনো সুস্থ মানুষেরই হতে পারে। গবেষণা ও চিকিৎসা-তথ্য অনুযায়ী, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। Cleveland Clinic ও Sleep Foundation- দুই সূত্রই এটিকে সাধারণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে কিছু পরিস্থিতিতে এটি বেশি চোখে পড়তে পারে।
১. ঘুমের ঘাটতি
নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ঘুমের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হতে পারে। এতে ঘুমিয়ে পড়ার সময় হিপনিক জার্ক হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
বিশেষ করে কয়েক দিন ধরে কম ঘুম, অনিয়মিত ঘুম বা অতিরিক্ত রাত জাগার পর কারও কারও এই ঝাঁকুনি বেশি হতে পারে।
২. অতিরিক্ত মানসিক চাপ
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ ঘুমিয়ে পড়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। মাথায় অনেক চিন্তা থাকলে শরীর বিছানায় গেলেও মস্তিষ্ক পুরোপুরি শান্ত হতে সময় নেয়। এই অবস্থায় ঘুমের পর্যায়ে প্রবেশের সময় হিপনিক জার্ক বেশি অনুভূত হতে পারে।
৩. বেশি ক্যাফেইন
বিকেল বা রাতে অতিরিক্ত কফি, চা, এনার্জি ড্রিংক বা অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে। ক্যাফেইন মস্তিষ্ককে বেশি সক্রিয় রাখে এবং ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এর ফলে হিপনিক জার্কও বেশি লক্ষ করা যেতে পারে।
৪. অতিরিক্ত শারীরিক ক্লান্তি
সারাদিন প্রচণ্ড পরিশ্রম বা শারীরিক ক্লান্তির পর দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার সময়ও কারও কারও হিপনিক জার্ক হতে পারে। Sleep Foundation ঘুমের ঘাটতি ও শারীরিক ক্লান্তিকে এর সাথে সম্পর্কিত কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
৫. ঘুমের আগে অতিরিক্ত ব্যায়াম
নিয়মিত ব্যায়াম সাধারণত ঘুমের জন্য উপকারী। তবে ঘুমানোর একেবারে কাছাকাছি সময়ে খুব তীব্র ব্যায়াম করলে শরীর ও মস্তিষ্ক তখনও সক্রিয় থাকতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি ঘুমের শুরুতে অস্বস্তি বা হিপনিক জার্ক বাড়াতে পারে।
হিপনিক জার্ক কি বিপজ্জনক?
সাধারণত নয়।
মাঝেমধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার সময় শরীর ঝাঁকুনি দেওয়া বা পড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হওয়া সাধারণত ক্ষতিকর নয় এবং কোনো গুরুতর রোগের লক্ষণও নয়।
অনেক মানুষই জীবনের কোনো পর্যায়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তাই এক-দুবার এমন হলে সাধারণত আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?
সব ধরনের ঘুমের মধ্যে ঝাঁকুনি কিন্তু হিপনিক জার্ক নয়।
যদি-
- প্রায় প্রতিরাতেই বারবার এমন হয়।
- ঝাঁকুনির কারণে ঘুমাতে সমস্যা হয়।
- বারবার ঘুম ভেঙে যায়।
- ঘুমানোর বিষয়টিই নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
- ঘুমের বাইরেও বারবার অনিচ্ছাকৃত পেশির সংকোচন হয়।
- ঝাঁকুনির সাথে অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকে।
তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। কারণ ঘুমের সময় অন্যান্য ধরনের নড়াচড়া বা মাংসপেশির সংকোচনের পেছনে ভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
এই ঝাঁকুনি কমানোর উপায় কী?
হিপনিক জার্ক পুরোপুরি বন্ধ করার কোনো নিশ্চিত উপায় নেই। তবে ঘুমের মান ভালো রাখলে এর প্রবণতা কমানো যেতে পারে।
১. নিয়মিত ঘুমের সময় মেনে চলুন: প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো ও জাগার চেষ্টা করুন।
২. রাতে ক্যাফেইন কমান: বিশেষ করে ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে কফি, চা বা এনার্জি ড্রিংক এড়িয়ে চলা ভালো।
৩. ঘুমের ঘাটতি পূরণ করুন: নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস তৈরি করুন।
৪. মানসিক চাপ কমান: ঘুমানোর আগে গভীর শ্বাস নেওয়া, হালকা বই পড়া বা শান্ত কোনো রুটিন অনুসরণ করা যেতে পারে।
৫. ঘুমের আগে অতিরিক্ত তীব্র ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন: ব্যায়াম দিনের অন্য সময়ে করা গেলে ভালো।
৬. ঘুমানোর আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমান: শান্ত ও নিয়মিত একটি ঘুমের রুটিন ঘুমের জন্য সহায়ক হতে পারে।
তাহলে ঘুমের মধ্যে পড়ে যাওয়ার অনুভূতি আসলে কী?
ঘুমিয়ে পড়ার সময় মস্তিষ্ক ও শরীর একসাথে জাগ্রত অবস্থা থেকে ঘুমের দিকে পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের সময় পেশি শিথিল হওয়া এবং স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকলাপ বদলে যাওয়ার সাথে সাময়িকভাবে হঠাৎ পেশির সংকোচন ঘটতে পারে।
সেই ঝাঁকুনির সাথে মস্তিষ্কে পড়ে যাওয়ার মতো একটি অনুভূতিও তৈরি হতে পারে।
তাই ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মনে হওয়া- ‘আমি পড়ে যাচ্ছি!’ বেশিরভাগ সময় সত্যিকারের পড়ে যাওয়ার সংকেত নয়; বরং ঘুমিয়ে পড়ার সময় শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তনেরই একটি অদ্ভুত অনুভূতি।
তবে এটি যদি খুব ঘন ঘন ঘটে, ঘুম নষ্ট করে বা ঘুমের বাইরেও অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি দেখা দেয়, তখন বিষয়টিকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
তথ্যসূত্র
- Sleep Foundation - Hypnic Jerks / Sleep Starts
- Cleveland Clinic - Myoclonus




