...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

১৩৪ কোটির বিএলআরআই প্রকল্প

গবেষণার ১২০ কোটি টাকা কার পেটে

ভুয়া ভাউচারে পিডি ও স্ত্রীর রামরাজত্ব

নাজমুল হাসান রাজ
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৪৭ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:১৮
Shares
গবেষণার ১২০ কোটি টাকা কার পেটে

ড. মো. সাজেদুল করিম সরকার। ছবি: সংগৃহীত

দেশের পোল্ট্রি খাতের গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে ১৩৪ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছিল সরকার। কিন্তু গবেষণার সুফল পাওয়া তো দূরের কথা, প্রকল্পটির অর্থের সিংহভাগই খরচ হয়েছে ভবন নির্মাণ, সরঞ্জাম কেনাকাটা আর অন্যান্য খাতে। মূল কাজ গবেষণা ও ফেলোশিপে ব্যয় দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) বাস্তবায়নাধীন পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের নথি ঘেঁটে বেরিয়ে এসেছে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির নানা তথ্য।

প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. মো. সাজেদুল করিম সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, নিজের স্ত্রীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে মোটা অঙ্কের ফেলোশিপ দিয়েছেন, দরপত্র ছাড়াই কোটি কোটি টাকার কাজ বণ্টন করেছেন এবং ভুয়া ভাউচারে অর্থ উত্তোলন করেছেন। টাইমস টুডের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১২০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৮১ কোটি ২৮ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে ভবন নির্মাণ, জমি অধিগ্রহণ ও সরঞ্জাম কেনায়। অথচ যে গবেষণার নামে এত আয়োজন, সেই গবেষণা ও ফেলোশিপ খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৫.৯৭ শতাংশ। গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অথচ শুধু পোল্ট্রির খাবার ও ফিড অ্যাডিটিভ কিনতেই খরচ দেখানো হয়েছে ১২ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যা গবেষণা বরাদ্দের প্রায় দ্বিগুণ। প্রশিক্ষণ খাতেও একই চিত্র। স্থানীয় প্রশিক্ষণে বরাদ্দ ৪ কোটি ১০ লাখ টাকা, যার ৪৫ শতাংশ খরচ দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে বিদেশি প্রশিক্ষণে বরাদ্দ ছিল ১ কোটি টাকা, কিন্তু কাগজে-কলমে খরচ দেখানো হয়েছে মাত্র ১ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অবহেলা আর ব্যয়ের এই অসংগতি সরকারি বরাদ্দের অপচয়ের স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।

স্ত্রীর জন্য পোস্ট-ডক ফেলোশিপ, মাসে ভাতা ১ লাখ ২০ হাজার

প্রকল্প পরিচালক ড. সাজেদুল করিমের স্ত্রী ড. ফারহানা শারমীনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের বলছে, কোনো জাতীয় দৈনিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি না দিয়েই চুপিসারে এই ফেলোশিপ দেওয়া হয়। ২০২২ সালের সরকারি তদন্তেও উঠে আসে, পিডি নিজেই এই সুযোগ তৈরি করেছেন এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ভিত্তিহীন নয়। বিএলআরআইয়ের স্থায়ী কর্মকর্তা না হয়েও পিডির স্ত্রী মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ভাতা পেয়েছেন। বরাদ্দকৃত অর্থের প্রায় ৬৫ শতাংশই তার ভাগে গেছে বলে নথিতে দেখা যায়।

প্রশিক্ষণের মঞ্চেও স্বামী-স্ত্রীর একচ্ছত্র আধিপত্য চোখে পড়ার মতো। ট্রেনিং কোর্সের নির্দেশক পিডি নিজেই, আবার বড় অঙ্কের সম্মানীর বিপরীতে তিনি একাধিক সেশনের প্রশিক্ষকও। পাশাপাশি তার স্ত্রীকেও সম্মানীভিত্তিক প্রশিক্ষক হিসেবে রাখা হয়েছে। স্থানীয় প্রশিক্ষণের ৪ কোটি ১০ লাখ টাকার বরাদ্দের বড় অংশই এভাবে একই পরিবারের হাতে গেছে বলে অভিযোগ।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এক জুনিয়র ট্রেনিং সহকারী ও হিসাবরক্ষকের মাধ্যমে ভুয়া দোকানের নামে কোটি কোটি টাকার সরবরাহ ভাউচার তৈরি করা হয়। দরপত্র ছাড়াই পছন্দের লোক দিয়ে সাড়ে ৩ কোটি টাকার রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজ করিয়ে নেওয়া হয়। বসানোর জায়গা না থাকা সত্ত্বেও ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে ৪টি ইনকিউবেটর। এ ছাড়া প্রকল্পের মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহন পিডির স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

এদিকে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না করেই মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। একইসাথে বাজেট বাড়ানো হয় অতিরিক্ত ১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

টাইমস টুডের হাতে আসা নথিতে দেখা যায়, প্রতিবেদনে প্রকল্প বিলম্বের কারণ ও বিদ্যমান সমস্যা শিরোনামে দুটি নির্দিষ্ট ঘর রয়েছে। কিন্তু পিডি ড. সাজেদুল করিমের স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে সেই দুটি ঘরই ফাঁকা রেখে জমা দেওয়া হয়েছে। কেন মেয়াদ বাড়ল এবং কেন ১০ কোটির বেশি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ লাগল, সরকারি নথিতে তার কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।

ড. সাজেদুল করিম সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড প্রচার করতেন। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএলআরআইয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ১৩৪ কোটি টাকার প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পান ড. সাজেদুল করিম সরকার। ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তার ভূমিকা নিয়ে সহকর্মীদের মনে নানা প্রশ্ন জাগছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সাজেদুল করিম টাইমস টুডেকে বলেন, নিয়ম মেনেই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তার দাবি, বিধি মোতাবেক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে তিনি সব কাজ করেছেন। তবে আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ততার সুবাদে তিনি পিডি হয়েছিলেন কি না, এ প্রশ্নের উত্তর তিনি এড়িয়ে যান। স্ত্রীর বিষয়েও তিনি কথা বলতে চাননি।
 
নথির জটিল হিসাব-নিকাশ ও ক্ষমতার বলয় ব্যবহার করে এসব অনিয়ম করা হয়েছে। তারা পুরো প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ ও কেনাকাটার নিরপেক্ষ নিরীক্ষা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কঠোর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে। অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে পোল্ট্রি খাতের এই মেগা প্রকল্প কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে- এমনটা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।