খুলনা মহানগরীর সিদ্দিকীয়া মহল্লার কাছেই নাহিদ হাসানদের পারিবারিক বাড়ি। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সেখানে গিয়ে দেখা গেল, পরিবারের অন্য শিশুদের সাথে খেলছে নাহিদ হাসান ও নুসরাত জাহান দম্পতির দুই সন্তান রাইয়ান হাসান ও ছয় বছরের রওদা হাসান। রাইয়ান কিছুটা চুপচাপ। মায়ের আর ফিরে না আসার বিষয়টি সে বুঝতে পারছে। কিন্তু ছয় বছরের রওদা এখনো পুরো বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেনি। তাই মাঝেমধ্যে স্বজনদের কাছে জানতে চায়, ‘আমি কাকে আম্মু বলে ডাকব?’
স্বজনেরা বলেন, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর তাদের জানা নেই।
নাহিদের বড় ভাই মাহমুদ হাসান সোহেল বলেন, ‘ওদের সুখের সংসার ছিল। নতুন সন্তান আসবে, এ নিয়ে পরিবারের সবাই আনন্দে ছিলাম। কীভাবে কী হয়ে গেল, এখনো বুঝতে পারছি না। ছোট মেয়েটার জন্য বেশি খারাপ লাগছে।’
নাহিদ ও নুসরাতের তৃতীয় সন্তান আসার কথা ছিল। চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের তারিখও ঠিক করা হয়েছিল। অনাগত সন্তানের নামও ঠিক করে রেখেছিল পরিবার। কিন্তু সন্তান জন্মের আগেই নুসরাতের মৃত্যু হয়।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর নুসরাতের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। তার রক্তে প্লাটিলেট নেমে যায় ৬২ হাজারে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, একটি আইসিইউ শয্যার জন্য তারা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে যোগাযোগ করেন। শেষ পর্যন্ত ঢাকার উদ্দেশে অ্যাম্বুলেন্সে রওনা হন নাহিদ। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ভাঙ্গার কাছে নুসরাতের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়। স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নুসরাতের গর্ভের সন্তানকেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
নুসরাত বটিয়াঘাটার ইউসুফিয়া দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। গর্ভধারণের পর চাকরি ছেড়ে দেন। সন্তানদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন তিনি। পরিবারের সদস্যরা জানান, বড় ছেলে রাইয়ানের ১৫ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। সন্তানদের মশা থেকে দূরে রাখতে নুসরাত নিজেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতেন।
নাহিদ হাসান খুলনায় গ্রামীণফোন সেন্টারের ডেপুটি ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত। স্ত্রী ও অনাগত সন্তানকে হারিয়ে এখন দুই সন্তানকে নিয়ে তার সামনে নতুন বাস্তবতা। নাহিদ বলেন, ‘কীভাবে কী হয়ে গেল, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
নুসরাতের মৃত্যুর কয়েক দিনের মধ্যেই আরেকটি পরিবারেও একই ধরনের শোক নেমে আসে। খুলনা নগরীর বসুপাড়ায় সাদিয়া আফরিন সুমাইয়ার বাবার বাড়ি। দ্বিতীয়বারের মতো মা হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। স্বামী শেখ ইশতিয়াজ সম্রাট পেশায় আইনজীবী। তাদের দেড় বছরের মেয়ে কেয়া।
পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন সুমাইয়া। একই সময়ে তার মা-বাবাও অসুস্থ ছিলেন। ১৬ সেপ্টেম্বর তার মায়ের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর বাবারও ডেঙ্গু ধরা পড়ে।
সুমাইয়া নিজের জ্বরকে প্রথমে গর্ভকালীন সমস্যা বলে মনে করেছিলেন। তাই হাসপাতালে যাননি। ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে হঠাৎ তার শরীরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। স্বজনেরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু আইসিইউ শয্যা না থাকায় স্বজনেরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে যোগাযোগ করেন। কোথাও শয্যা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাকে লেবার ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরদিন ভোরে মারা যান সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সুমাইয়া। তার গর্ভের সন্তানকেও বাঁচানো যায়নি।
মায়ের মৃত্যুর অর্থ বোঝার বয়স হয়নি দেড় বছরের কেয়ার। সে শুধু মাকে খুঁজে বেড়ায়। স্বজনদের কাছে বারবার জানতে চায়, আমার সোনা মা কোথায়? এখন কেয়াকে দেখাশোনা করছেন তার খালা মারজিয়া। তিনি বলেন, মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি এখনো বুঝতে পারছে না কেয়া। একটু পরপর মাকে খোঁজে।
নুসরাত ও সুমাইয়ার মৃত্যুর ঘটনায় দুটি পরিবারেই এখন একই ধরনের শূন্যতা। দুই নারীই ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। দুজনেরই ছোট সন্তান রয়েছে। আর দুজনেরই গর্ভের সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মারা গেছে।
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে উঠে এসেছে জরুরি সময়ে আইসিইউ শয্যা না পাওয়ার বিষয়টি। তবে রোগীদের চিকিৎসা ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে আইসিইউ সংকটের ভূমিকা কী ছিল, তা চিকিৎসা নথি ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।


