কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বিয়ের আশ্বাসে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগ। এতে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন ২১ বছর বয়সী এক এতিম তরুণী। পরে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর সেই নবজাতককে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠে। এমনকি শিশুটিকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও। চার দিন পর অভিযান চালিয়ে নবজাতকটিকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে মায়ের কোলে। এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে চারজনকে। তাদের মধ্যে হাসপাতালের একজন নার্সও রয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কনকাপৈত ইউনিয়নের কালিকোট গ্রামে। নবজাতককে সরিয়ে নেওয়া ও বিক্রির অভিযোগে করা মানব পাচার মামলায় হাসপাতালের ম্যানেজার ও নার্সসহ একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তবে নবজাতক বিক্রির অভিযোগ এবং ঘটনার সাথে কারা কীভাবে জড়িত, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী খাদিজা আক্তারের বয়স ২১ বছর। তিনি একজন এতিম ও অসচ্ছল তরুণী। তার অভিযোগ, একই এলাকার আবির হোসেন (১৯) বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সাথে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক করেন। একপর্যায়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পরে গর্ভের সন্তান নষ্ট করার জন্য চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। কিন্তু খাদিজা তাতে রাজি হননি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর অভিযুক্ত আবির হোসেন আত্মগোপনে চলে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
একদিকে অনাগত সন্তানকে ঘিরে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে পরিবারের অসহায়ত্ব—এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে খাদিজার। গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে চৌদ্দগ্রাম বাজারের প্রাইম প্রাইভেট হাসপাতালে একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন তিনি। সন্তান জন্মের পর মা ও নবজাতককে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই থাকার কথা ছিল পরিবারের আনন্দ ও স্বস্তি। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘটে যায় আরেক ঘটনা।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২৩ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে নবজাতকটিকে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে শিশুটিকে অন্যত্র রাখা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। নবজাতকের পিতৃপরিচয় আড়াল করা এবং পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে শিশুটিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অন্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
নবজাতককে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এ বিষয়ে অভিযোগের বিভিন্ন বিবরণে অর্থের পরিমাণ নিয়ে পার্থক্য রয়েছে। মামলার বর্ণনায় হাসপাতালের প্রসব ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বিল বাবদ ৫৫ হাজার টাকা পরিশোধের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ৫০ হাজার টাকায় নবজাতক বিক্রির অভিযোগ, অর্থ লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
নবজাতককে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয়। পরে চৌদ্দগ্রাম থানা-পুলিশ ও কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যরা অভিযান চালান। সোমবার, ২৬ অক্টোবর ভোরে উপজেলার হিঙ্গুলা এলাকা থেকে চার দিন বয়সী নবজাতকটিকে উদ্ধার করা হয়। পরে শিশুটিকে তার মা খাদিজা আক্তারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
শিশুটিকে উদ্ধারের ঘটনায় স্বস্তি ফিরলেও নবজাতককে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেওয়ার পেছনে কারা জড়িত, কেন তাকে অন্যত্র নেওয়া হয়েছিল এবং অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তরের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে। একই সাথে অসহায় এক তরুণীর অভিযোগের সত্যতা এবং হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে।
এ ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা হয়েছে। খাদিজা আক্তার বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় আবির হোসেনকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে। বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে শারীরিক সম্পর্ক, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর গর্ভপাতের জন্য চাপ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের বিষয়ে তার অভিযোগ মামলায় তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে নবজাতককে সরিয়ে নেওয়া ও বিক্রির অভিযোগে মানব পাচার আইনে পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করেছে। চৌদ্দগ্রাম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুর রহমান টুকু মামলাটির বাদী। এ মামলায় আবির হোসেনকে প্রধান আসামি করে আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে হাসপাতালের ম্যানেজার ও নার্সসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের নাম রয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে হাসপাতালের একজন নার্স এবং নবজাতককে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরও কয়েকজন রয়েছেন। গ্রেফতার ব্যক্তিদের সোমবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে মামলার সব আসামির ভূমিকা এবং নবজাতক বিক্রির অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত আবির হোসেনসহ অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নবজাতককে সরিয়ে নেওয়ার সাথে কারা জড়িত ছিলেন, শিশুটিকে কোথায় এবং কার হেফাজতে রাখা হয়েছিল, কোনো আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফ হোছাইন জানান, নবজাতক বিক্রির ঘটনায় মানব পাচার মামলায় থানার উপপরিদর্শক সাইফুর রহমান টুকু বাদী হয়ে আবিরকে প্রধান আসামি করে আটজনের নাম উল্লেখসহ মোট ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুটি মামলা হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেফতার করে সোমবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রধান অভিযুক্ত আবির হোসেনসহ অন্য আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।


