হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা ও গায়ক টিম কারি মারা গেছেন। ‘দ্য রকি হরর পিকচার শো’ সিনেমায় ড. ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টার চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পাওয়া এই তারকার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) লস অ্যাঞ্জেলেসের টোলুকা লেকে নিজের বাড়িতে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন টিম কারি। তার দীর্ঘদিনের ম্যানেজার ও বন্ধু মার্শিয়া হারউইটজ মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে হলিউড গণমাধ্যম ভ্যারাইটিও এ কিংবদন্তির মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়েছে। তবে তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি।
২০১২ সালে গুরুতর স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই নানা শারীরিক জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন টিম কারি। স্ট্রোকের পর তার চলাফেরায় গুরুতর সমস্যা দেখা দেয় এবং পরবর্তী সময়ে হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভর করতে হয়। শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অভিনয় ও কণ্ঠশিল্পের কাজ চালিয়ে গেছেন তিনি।
টিম কারির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় চরিত্র নিঃসন্দেহে ড. ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টার। ১৯৭৩ সালে লন্ডনের মঞ্চে প্রথমবার চরিত্রটিতে অভিনয় করেন তিনি। দুই বছর পর, ১৯৭৫ সালে একই চরিত্রে ‘দ্য রকি হরর পিকচার শো’ সিনেমায় হাজির হন। মুক্তির সময় সিনেমাটি বড় ধরনের সাফল্য না পেলেও সময়ের সঙ্গে এটি দর্শকদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং পরিণত হয় কাল্ট ক্লাসিকে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে সিনেমাটির মধ্যরাতের প্রদর্শনী ঘিরে গড়ে ওঠে বিশাল ভক্তগোষ্ঠী। দর্শকেরা সিনেমার সংলাপের সঙ্গে সংলাপ বলতেন, গান ও নাচে অংশ নিতেন। এমনকি অনেকেই সিনেমার চরিত্রগুলোর পোশাক পরে প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত হতেন। ড. ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টার চরিত্রটি টিম কারিকে পপ সংস্কৃতির অন্যতম স্মরণীয় মুখে পরিণত করে।
তবে ‘দ্য রকি হরর পিকচার শো’-এর সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না তার ক্যারিয়ার। স্টিফেন কিংয়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ১৯৯০ সালের টিভি মিনিসিরিজ ‘ইট’-এ পেনিওয়াইজ দ্য ক্লাউন চরিত্রে অভিনয় করেও ব্যাপক প্রশংসা পান তিনি। তার ভয়ংকর উপস্থিতি ও অভিনয় পেনিওয়াইজকে দর্শকদের কাছে স্মরণীয় এক আতঙ্কের চরিত্রে পরিণত করে।
এ ছাড়া ‘ক্লু’, ‘অ্যানি’, ‘লিজেন্ড’, ‘হোম অ্যালোন ২: লস্ট ইন নিউইয়র্ক’, ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’, ‘মাপেট ট্রেজার আইল্যান্ড’ ও ‘চার্লি’স অ্যাঞ্জেলস’-এর মতো জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করেছেন টিম কারি। ‘হোম অ্যালোন ২’-এ হোটেলের কনসিয়ার্জ এবং ‘লিজেন্ড’-এ ভিলেন ডার্কনেস চরিত্রেও দর্শকদের নজর কাড়েন তিনি।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি থিয়েটারেও ছিল তার দীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ার। ‘অ্যামাডিউস’, ‘মাই ফেভারিট ইয়ার’ এবং ‘মন্টি পাইথন’স স্প্যামালট’-এর মতো মঞ্চনাটকে অভিনয়ের জন্য তিনবার টনি অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি।
অ্যানিমেশনেও কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন টিম কারি। ‘পিটার প্যান অ্যান্ড দ্য পাইরেটস’ অ্যানিমেটেড সিরিজে ক্যাপ্টেন হুকের কণ্ঠ দেওয়ার জন্য ১৯৯১ সালে ডেটাইম এমি অ্যাওয়ার্ড জেতেন তিনি।
২০১২ সালের স্ট্রোক তার জীবন ও ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন এনে দেয়। দীর্ঘ সময় শারীরিক ও স্পিচ থেরাপি নেওয়ার পরও অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে কাজ চালিয়ে যান তিনি। পরবর্তী সময়ে শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে অভিনয়ের পাশাপাশি কণ্ঠশিল্পের কাজেই বেশি মনোযোগ দেন।
২০১৬ সালে ‘দ্য রকি হরর পিকচার শো: লেটস ডু দ্য টাইম ওয়ার্প এগেইন’-এর টিভি সংস্করণে আবারও ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টার চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। তবে এবার অভিনয়ের বদলে বর্ণনাকারীর ভূমিকায় ছিলেন। ২০২০ সালেও একটি লাইভ টেবিল রিডিংয়ে আবার ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টার চরিত্রে অংশ নেন।
শারীরিক অসুস্থতার কারণে কাজের পরিমাণ কমে গেলেও পুরোপুরি অবসর নেননি টিম কারি। ২০২৪ সালের হরর সিনেমা ‘স্ট্রিম’-এর মাধ্যমে বড় পর্দায় আবারও দেখা যায় তাকে। সংগীতেও ছিল তার সক্রিয় উপস্থিতি। নিজের ব্যান্ডের সঙ্গে গান পরিবেশনের পাশাপাশি একাধিক অ্যালবামও প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে টিম কারি কখনো নিজেকে প্রচলিত নায়কোচিত চরিত্রের মধ্যে আটকে রাখেননি। বিচিত্র, অদ্ভুতুড়ে, ভয়ংকর ও খলচরিত্রে তার অভিনয় তাকে তৈরি করে দিয়েছিল এক স্বতন্ত্র পরিচয়। তবে ড. ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টার চরিত্রটিই তাকে বিশ্বজুড়ে এমন এক তারকায় পরিণত করে, যাকে চলচ্চিত্র ও পপ সংস্কৃতির ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণ করা হবে।

