অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে আগামী ৬ মাসে অতিরিক্ত গরমে সাড়ে চার লাখেরও বেশি মানুষ মারা যেতে পারে বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ে জর্জরিত দরিদ্র দেশগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) শিকাগো ইউনিভার্সিটির ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব থেকে প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের এই প্রাক্কলনে এল নিনোর কারণে তাপপ্রবাহজনিত অতিরিক্ত মৃত্যুর সম্ভাব্য সংখ্যা সাধারণ বছরের গড়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে স্থলভাগের তাপমাত্রা প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস (২.১ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে এবং অত্যন্ত গরমের দিনগুলো স্বাভাবিক বছরের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেশি ঘন ঘন দেখা দিতে পারে।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলো এবং আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এই বিপর্যয়ের শিকার হবে সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেদনে সাহেল অঞ্চলে প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। এর মধ্যে যেকোনো একক দেশের হিসেবে নাইজেরিয়ায় সর্বোচ্চ ৩১ হাজার ৪০০ জনের মৃত্যুর প্রাক্কলন করা হয়েছে, যার পরেই রয়েছে ইন্দোনেশিয়া (১৯,৩০০ জন) এবং সুদান (১৭,৬০০ জন)। এছাড়া ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ায় সম্মিলিতভাবে ১৯,৪০০ জন, ভারতে ১৫,৮০০ জন এবং ব্রাজিলে ১৩,৩০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ল্যাবটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং গবেষণার সহ-লেখক মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেছেন, এই ফলাফলগুলো প্রমাণ করে যে তাপমাত্রা যেখানে ইতোমধ্যে বেশি এবং মানুষের আয় তুলনামূলক কম, সেখানেই তাপপ্রবাহ সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, আপনি যদি ইতোমধ্যে একটি উষ্ণ স্থানে থাকেন, তবে অতিরিক্ত দুই ডিগ্রি তাপমাত্রা পরিস্থিতিকে আরও অনেক বেশি বিপজ্জনক করে তুলবে।
তিনি আরও যোগ করেন যে ধনী অঞ্চলগুলোতে সাধারণত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বেশি থাকে। গ্রিনস্টোন বলেন, এল নিনোর প্রভাব কেটে যাওয়ার পরও তাপের ঝুঁকি রয়ে যেতে পারে এবং এর ধাক্কা আগামী গ্রীষ্ম পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এদিকে, ভারতের এনআরডিসির তাপ বিশেষজ্ঞ অভিয়ান্ত তিওয়ারি বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন যে এই প্রাক্কলনগুলোর ফলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, কাগজে-কলমে ভালো পরিকল্পনা থাকলেও ভারতেও তহবিল সংগ্রহ ও তার বাস্তবায়নের জায়গাটি এখনও বেশ দুর্বল। তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রস্তুতির প্রকৃত মাপকাঠি হলো আমরা কতগুলো তাপ সতর্কবার্তা জারি করি তা নয়, বরং আমরা মানুষকে কতটা কার্যকরভাবে সুরক্ষা দিই এবং প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কতখানি কমাতে পারি।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের জুনে এল নিনো বিকশিত হতে শুরু করে এবং এটি সর্বকালের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চক্রাকারে ঘটে চলা এই প্রাকৃতিক আবহাওয়া প্যাটার্নটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও বেশি তীব্র বা ‘সুপারচার্জড’ হয়ে উঠছে।
চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতে জাতিসংঘের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে যে আগামী ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনো অব্যাহত থাকার শতভাগ সম্ভাবনা রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, এর বিপজ্জনক প্রভাব ২০২৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে।


