ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে আগামী ৭ নভেম্বরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে বলে দাবি করেছেন মার্কিন সাংবাদিক টাকার কার্লসন। তার অভিযোগ, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অব্যাহত চাপের মুখে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এ দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সোমবার (২ নভেম্বর) ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এসব দাবি করেন কার্লসন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার পোস্টটি ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি বার দেখা হয়।
কার্লসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের প্রায় ৩০০ ফুট গভীরে অবস্থিত গ্রানাইট স্তর ভেদ করে প্রচলিত মার্কিন অস্ত্রের পক্ষে সেখানে পৌঁছানো কঠিন। এ কারণে তিনি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এক অজ্ঞাতনামা পর্যবেক্ষকের বরাত দিয়ে কার্লসন দাবি করেন, নেতানিয়াহু এ বিষয়ে প্রতিদিন ট্রাম্পের সাথে ফোনে কথা বলছেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকে ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন পারমাণবিক নীতিতে এমন পরিবর্তন এনেছে, যাতে যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পথ সহজ হয়। তবে এ দাবিরও স্বাধীন কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান দেখা গেছে। গত ১৫ অক্টোবর নিউজম্যাক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা তার নেই।
তবে অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার ট্রাম্প ইরানের এক বা দুটি পারমাণবিক স্থাপনা নিষ্ক্রিয় করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ১০ মিনিটের মধ্যেই এ কাজ করতে পারে।
কার্লসন সতর্ক করে বলেন, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে পারমাণবিক হামলা হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। তার দাবি, এর ফলে প্রায় ১০০ কোটি মানুষের পানির উৎস দূষিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। কার্লসনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে ওই প্রণালীতে বিশ্বের আনুমানিক ৮৫০টি সুপারট্যাঙ্কারের মধ্যে ১১টি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশিয়ার অবস্থান নিয়েও উদ্বেগজনক দাবি করেছেন কার্লসন। তার বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে পারমাণবিক হামলা চালালে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে একই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পাবে মস্কো। এমন পরিস্থিতিতে ভারত-পাকিস্তান এবং উত্তর কোরিয়া-দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যেও পারমাণবিক উত্তেজনা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
কতটা সুরক্ষিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন?
ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন, যা কু-এ কোলং গাজ লা নামেও পরিচিত, নাতাঞ্জ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনা। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্য অনুযায়ী, এটি অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি এলাকা। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির (আইএসআইএস) হিসাবে, স্থাপনাটির গভীরতা অন্তত ১০০ মিটার। ২০২০ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। সংস্থাটির প্রকাশিত ৭ অক্টোবরের স্যাটেলাইট চিত্রে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলো মাটির নিচে বন্ধ অবস্থায় দেখা যায়।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক হিসাব নিয়েও প্রশ্ন
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে ইরানে হামলার সম্ভাব্য চাপের যোগসূত্র টেনেছেন কার্লসন। তার দাবি, নতুন সরকার গঠনের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে নেতানিয়াহুর জন্য যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ইসরায়েলের কোনো রাজনৈতিক জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের আসন ৪৮টি এবং আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর আসন ১৯টি। ১২০ সদস্যের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। ফলে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সমঝোতা জরুরি হয়ে পড়েছে।
কার্লসন আরও দাবি করেন, গত ২৭ সেপ্টেম্বর আবুধাবি সফরে গিয়ে নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে আমিরাত তাতে রাজি হয়নি বলে তার বক্তব্য। অন্যদিকে, তেহরানের নীতিনির্ধারকদের সাথে কথা বলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কার্লসন দাবি করেন, ইরানের ভেতরে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে।
এদিকে, অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে গত শনিবার উত্তপ্ত আলোচনার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহু সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে চাপ দিলেও ট্রাম্প কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে আগ্রহী।


