একসময় দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক, কোরআনের ক্বারি এবং স্থানীয় মসজিদের ইমাম হিসেবে সম্মানিত ছিলেন শামছুল হক ক্বারি। দীর্ঘ ৩৫ বছর শিক্ষার্থীদের দ্বীনি শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষকে কোরআনের আলোয় আলোকিত করেছেন। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মানুষটিই আজ অভাব-অনটন আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
শেরপুরের চাঁন্দেরনগর মসলিমপাড়ায় জরাজীর্ণ একটি ঘরে বসবাস করছেন ৮৮ বছর বয়সী শামছুল হক ক্বারি ও তার ৭৫ বছর বয়সী স্ত্রী রেজিয়া বেগম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই দম্পতির মাথার ওপর থাকা শেষ আশ্রয়টিও এখন ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, শামছুল হক ক্বারি চাঁন্দেরনগর কোহাকান্দা এম.আর. দাখিল মাদ্রাসায় টানা ৩৫ বছর শিক্ষকতা করেন। ২০১৩ সালে অবসরে যান তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন স্থানীয় মসজিদে ইমামতিও করেছেন।
অভাব-অনটনের কারণে বহু আগেই বিক্রি হয়ে যায় তার আবাদি জমি। সম্প্রতি বিক্রি হয়ে যায় ভিটামাটিও। বর্তমানে যে ব্যক্তি বাড়ির জায়গাটি কিনেছেন, তার মানবিক সহানুভূতির কারণেই সেখানে বসবাসের সুযোগ পেয়েছেন বৃদ্ধ এই দম্পতি।
তাদের বসবাসের দুই কক্ষের একটি ঘর ইতোমধ্যে ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। অন্য ঘরটিও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। চালের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়ায় বৃষ্টির সময় ঘরের ভেতর পানি পড়ে। সামান্য বাতাসেই কেঁপে ওঠে পুরো ঘর। যে কোনো সময় সেটিও ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
একই ঘরের এক পাশে বসবাস, অন্য পাশে মেঝেতে চুলা বসিয়ে রান্না করেন রেজিয়া বেগম। সীমাহীন কষ্টের মধ্যেই চলে তাদের দৈনন্দিন জীবন।
খাবারের সংকটও নিত্যসঙ্গী। অনেক সময় একবেলা খাবার জুটলেও দুইবেলা না খেয়েই দিন পার করতে হয় বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিন ছেলে ও দুই মেয়ের জনক হলেও বর্তমানে সন্তানদের সাথে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। এমনকি বড় ছেলে বাড়ি বিক্রির টাকা নেওয়ার পর বাবা-মায়ের খোঁজও রাখেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে নিজের সন্তানদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে রাজি নন শামছুল হক ক্বারি ও রেজিয়া বেগম। চোখে জল নিয়ে তারা শুধু বলেন, ‘আল্লাহ তাদের ভালো রাখুন।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একজন শিক্ষক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে শামছুল হক ক্বারি সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন। জীবনের শেষ সময়ে তার এমন অসহায় অবস্থা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তারা সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের মানবিক সহায়তার আহ্বান জানান।
একসময় যিনি মানুষকে নৈতিকতা, মানবতা ও কোরআনের শিক্ষা দিয়েছেন, আজ তিনিই বেঁচে থাকার জন্য অন্যের সহানুভূতির ওপর নির্ভরশীল। জীবনের শেষ অধ্যায়ে এই প্রবীণ দম্পতির জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে হয়তো তাদের বাকি দিনগুলো কিছুটা হলেও স্বস্তিতে কাটবে।


