...|...|...

রাজনীতি

‘উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা’- জিন্নাহর সেই ঘোষণায় ঢাকায় কী ঘটেছিল?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১২:০১ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১২:০৩
Shares
‘উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা’- জিন্নাহর সেই ঘোষণায় ঢাকায় কী ঘটেছিল?

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র সাত মাসের মাথায়, ১৯৪৮ সালের মার্চে পূর্ববঙ্গে ভাষা নিয়ে উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ঢাকায় আসেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তার এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত মুহূর্ত হয়ে আছে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে দেওয়া তার বক্তব্য- যেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়। এই ঘোষণা পূর্ববঙ্গের মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে এবং মাতৃভাষার দাবিকে আরও জোরালো করে তোলে।

উত্তপ্ত এক সময়ে ঢাকায় জিন্নাহ

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় পৌঁছান জিন্নাহ। তখন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে মাত্র কয়েক মাস আগে, আর নতুন রাষ্ট্রের দুই ভূখণ্ড- পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক নানা প্রশ্নে মতপার্থক্য ততদিনে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এসব প্রশ্নের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি।

কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জোরালো হলেও পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। ফলে বাংলাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষার দাবিতে ধর্মঘট পালিত হয়। ঠিক এমনই এক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে জিন্নাহ ঢাকায় পা রাখেন।

২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর ঘোষণা

ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ২১ মার্চ এক বিশাল জনসভায় বক্তব্য দেন জিন্নাহ। সেখানে তিনি বলেন, প্রাদেশিক পর্যায়ে বাংলা ব্যবহারের বিষয়টি পূর্ববঙ্গের মানুষ নিজেরাই ঠিক করতে পারবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে তার অবস্থান ছিল একেবারে ভিন্ন ও অনড়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন-

"The State Language of Pakistan is going to be Urdu and no other language."

অর্থাৎ, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে তিনি একমাত্র উর্দুকেই দেখতে চেয়েছিলেন। এর পেছনে জিন্নাহর যুক্তি ছিল- একটি রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধভাবে পরিচালনার জন্য একটিমাত্র রাষ্ট্রভাষা থাকা প্রয়োজন। তার ভাষায়, একটি অভিন্ন রাষ্ট্রভাষা ছাড়া কোনো জাতি দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ থেকে কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে না।

বাংলার জন্য আসলে কী বলেছিলেন জিন্নাহ?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। ২১ মার্চের বক্তব্যে জিন্নাহ বলেছিলেন, পূর্ববঙ্গের মানুষ প্রাদেশিক পর্যায়ে বাংলা ব্যবহার করবে কি না, সে সিদ্ধান্ত প্রদেশের মানুষেরই। অর্থাৎ প্রাদেশিক ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহারের অধিকার তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করেননি।

কিন্তু কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে তার অবস্থান ছিল অনমনীয়- উর্দু, এবং কেবল উর্দু। প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভাষা-নীতির এই পার্থক্যই পরবর্তী সময়ে ভাষা-রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে।

'না, না'- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও বাধার মুখে জিন্নাহ

২১ মার্চের বক্তব্যের তিন দিন পর, ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তনেও ভাষা প্রশ্নে আবার বক্তব্য দেন জিন্নাহ। সেখানেও তিনি উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অনড় থাকেন।

তবে এবার ঘটনা ভিন্ন মোড় নেয়- তার বক্তব্যের সময় উপস্থিত শিক্ষার্থীদের একাংশ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানায়। সমসাময়িক বর্ণনায় সভাস্থলে 'No, no' ধরনের প্রতিবাদধ্বনির কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, খোদ রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠাতার সামনেই ঢাকার শিক্ষার্থীরা তার রাষ্ট্রভাষা-নীতির বিরুদ্ধে সরাসরি আপত্তি জানাতে দ্বিধা করেননি।

কেন আপত্তি তুলেছিল পূর্ববঙ্গের মানুষ?

কারণটি সহজ- পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ছিল বাংলাভাষী পূর্ববঙ্গের মানুষ। অথচ কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে এমন একটি ভাষাকে বেছে নেওয়া হচ্ছিল, যা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষাই ছিল না।

তাই বাংলার ভাষা আন্দোলনের পেছনে শুধু ভাষাগত আবেগই কাজ করেনি; এর সঙ্গে ক্রমশ জড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনে অংশগ্রহণ, শিক্ষা, চাকরি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোও। ধীরে ধীরে ভাষার দাবি রূপ নিতে শুরু করে বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাতন্ত্র্যের এক বৃহত্তর আন্দোলনে।

জিন্নাহর বক্তব্যের পর কি আন্দোলন থেমে গিয়েছিল?

না, বরং উল্টোটাই ঘটে। জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের মার্চে ঢাকা সফর শেষে ফিরে গেলেও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি থেমে থাকেনি। বরং পরবর্তী কয়েক বছরে এই আন্দোলন আরও ব্যাপক ও সংগঠিত রূপ নেয়।

এই ধারাবাহিকতারই চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৫২ সালে। ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান কয়েকজন। পরবর্তীকালে এই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনই বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে 'ভাষা আন্দোলন' নামে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।

শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল?

জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকেনি। ১৯৫৬ সালে প্রণীত পাকিস্তানের সংবিধানে উর্দু ও বাংলা- দুটি ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ, ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ যে 'উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা' অবস্থান নিয়েছিলেন, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই পাকিস্তানের সাংবিধানিক কাঠামোয় তার পরিবর্তন ঘটে যায়।

এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়- পূর্ববঙ্গের ভাষা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ে সফল হয়েছিল।

একটি ঐতিহাসিক বৈপরীত্য

জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের ভাষণকে ঘিরে ইতিহাসের একটি বড় বৈপরীত্য ঠিক এখানেই লুকিয়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রধান রূপকার হিসেবে জিন্নাহ নতুন রাষ্ট্রের ঐক্য ধরে রাখতে একটি অভিন্ন রাষ্ট্রভাষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। কিন্তু পূর্ববঙ্গের মানুষ তাদের মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি থেকে এক চুলও সরে আসেনি।

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে ভাষার এই প্রশ্ন কেবল ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি- এটিই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের বৃহত্তর আন্দোলনের ভিত্তি। আর সেই ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে আসে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

জিন্নাহর সেই বক্তব্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোথায়?

১৯৪৮ সালের মার্চে জিন্নাহর ঢাকা সফরকে তাই নিছক একটি রাজনৈতিক সফর হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের বক্তব্য এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তব্য- এই দুটি ঘটনা পূর্ববঙ্গের ভাষা-রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। তার 'উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা' অবস্থানের বিপরীতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি বরং আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।

ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায় আমাদের দেখায়- একটি ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্ন কীভাবে ধীরে ধীরে জাতীয় পরিচয়, রাজনৈতিক অধিকার এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার দাবির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে যেতে পারে।

জিন্নাহর সেই বক্তব্যের পর ইতিহাসের পথ

১৯৪৭- পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা

১৯৪৮- জিন্নাহর 'উর্দু' ঘোষণা

১৯৫২- ভাষা আন্দোলন ও ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তদান

১৯৫৬- বাংলা ও উর্দু রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি

১৯৬৬- ছয় দফা

১৯৬৯- গণঅভ্যুত্থান

১৯৭০- নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়

১৯৭১- বাংলাদেশের স্বাধীনতা

ইতিহাসের একটি কঠিন প্রশ্ন

জিন্নাহ যদি ১৯৪৮ সালে বাংলাকেও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিতেন, তাহলে কি পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পর্কের গতিপথ ভিন্ন হয়ে যেত?

এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর ইতিহাস কখনো দেবে না। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়- ভাষার প্রশ্নটি বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আর ১৯৪৮ সালের মার্চে ঢাকায় জিন্নাহর 'উর্দু' ঘোষণা সেই দীর্ঘ ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আজও রয়ে গেছে।