ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে মদ, জুয়া, নাইট ক্লাব, প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনমূলক সেবা কিংবা শরিয়াহবিরোধী বিভিন্ন খাতে অর্থ পরিশোধ করা যাবে না। ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কার্ড পরিচালনায় এমন বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে সমন্বিত নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ‘ইসলামী ক্রেডিট কার্ড কার্যক্রমের নির্দেশিকা’ প্রকাশ করা হয়। এর আগে সোমবার নীতিমালাটি প্রণয়ন করা হয় এবং মঙ্গলবার তা ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, দেশে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম ও ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে শরিয়াহসম্মত কার্ডভিত্তিক লেনদেনের চাহিদাও বেড়েছে। এ কারণে ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড পরিচালনায় স্বচ্ছতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, গ্রাহক সুরক্ষা ও শরিয়াহ পরিপালন নিশ্চিত করতে একটি পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড দিয়ে শরিয়াহবিরোধী বা বেআইনি কোনো পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধ করা যাবে না। এ ধরনের লেনদেন বন্ধ রাখতে ব্যাংকগুলোকে সিস্টেম পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ‘মার্চেন্ট ক্যাটাগরি কোড’ ব্লক করে রাখতে হবে।
এই কার্ড ব্যবহার করে মদ ও মদের দোকান, জুয়া ও বাজির ব্যবসা, ক্যাসিনো, লটারি, অনলাইন বেটিং, নাইট ক্লাব, বার, ট্যাভার্ন, ককটেল লাউঞ্জ, ডিসকোথেক ও প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনমূলক ব্যবসায় অর্থ পরিশোধ নিষিদ্ধ থাকবে। একই সঙ্গে ব্রুয়ারি, ডিস্টিলারি, ওয়াইনারি এবং যেসব দোকানের প্রধান ব্যবসা অ্যালকোহল—সেখানেও এই কার্ড ব্যবহার করা যাবে না।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকছে শুকর ও শুকরের মাংস-সম্পর্কিত ব্যবসা, হালাল নয় এমন মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও কসাইখানা, সুদভিত্তিক আর্থিক সেবা এবং প্রচলিত বা সাধারণ বীমা সেবাও।
এ ছাড়া ম্যাসাজ পার্লার, এসকর্ট সার্ভিস, অবৈধ ডেটিং বা ম্যাচমেকিং সেবা, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি কনটেন্ট, প্রকাশনা, ভিডিও ও ইন্টারনেট সেবার বিলও ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দেওয়া যাবে না।
তামাকজাত পণ্য এবং যেসব দোকানের প্রধান ব্যবসা তামাক বা তামাক-সম্পর্কিত পণ্য, সুদভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী পন শপ বা বন্ধকী দোকান, অন্য ধর্মের মূর্তি, প্রতিমা ও উপাসনাসংক্রান্ত সামগ্রী বিক্রির ব্যবসাও নিষিদ্ধ তালিকায় রাখা হয়েছে।
একই সঙ্গে জ্যোতিষশাস্ত্র, ভাগ্য গণনা, অলৌকিক বা সংশ্লিষ্ট সেবা, ক্রিপ্টো সম্পদের লেনদেন এবং জল্পনামূলক মার্জিন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মেও এ কার্ড ব্যবহার করা যাবে না।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো গ্রাহক নিষিদ্ধ বা বেআইনি লেনদেনে ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে কার্ডটি বাতিল করবে এবং বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাবে।
ব্যাংক যেসব ফি নিতে পারবে
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংক শুধু কার্ড ইস্যু, নবায়ন, প্রতিস্থাপন, নেটওয়ার্ক সুবিধা ও হিসাব রক্ষণাবেক্ষণের মতো নির্ধারিত সেবার জন্য ‘উজরহ’ বা সেবামাশুল নিতে পারবে। এই মাশুল গ্রাহকের বকেয়া অর্থ, ঋণসীমা কিংবা বিল পরিশোধে বিলম্বের সঙ্গে কোনোভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না।
গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধ করতে না পারলে ব্যাংক বিলম্ব ফি নিজের আয় হিসেবে নিতে পারবে না। তবে চুক্তির সময় গ্রাহক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দাতব্য কাজে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন। সেই অর্থ ব্যাংকের আয়ের বাইরে আলাদা দাতব্য হিসাবে জমা হবে এবং শরিয়াহ কমিটির তত্ত্বাবধানে বিতরণ করা হবে।
নিরাপত্তায় নতুন শর্ত
কার্ড চালুর আগে গ্রাহকের কাছ থেকে ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড বা ওটিপির মাধ্যমে সম্মতি নিতে হবে। একই সঙ্গে কার্ডের তথ্য গোপন রাখা এবং ‘টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন’ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কার্ড হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে গ্রাহকের ব্লক করার অনুরোধ পাওয়ার পর অননুমোদিত লেনদেনের অর্থ সাত কার্যদিবসের মধ্যে ফেরত দিতে হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের ভিত্তি হবে ‘কর্জ হাসান’ বা সুদমুক্ত ঋণ এবং ‘উজরহ’ বা সেবামূল্য। প্রচলিত ক্রেডিট কার্ডের মতো গ্রাহকের ঋণের ওপর ভিত্তি করে এটিকে ব্যাংকের আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। পাশাপাশি গ্রাহক যাতে আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় না করেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে ব্যাংককে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে নিবন্ধিত যেকোনো ইসলামি ব্যাংক কিংবা সাধারণ ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো বা শাখা এই কার্ড ইস্যু করতে পারবে। তবে বৈদেশিক মুদ্রা বা দ্বৈত মুদ্রার কার্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অনুমোদিত ডিলার হতে হবে।
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড সেবা দিয়ে আসছে। নতুন নির্দেশিকা এসব ব্যাংকের জন্য একটি অভিন্ন নিয়ন্ত্রক কাঠামো হিসেবে কার্যকর হবে।


