উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপের দেশগুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে নানা কারণে। মানসম্মত শিক্ষা, আন্তর্জাতিক পরিবেশ, গবেষণার সুযোগ এবং পড়াশোনার পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্তে কাজ করার সুযোগ সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তৈরি করছে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। তবে দেশভেদে শিক্ষার্থীদের কাজের অনুমতি, কর্মঘণ্টা ও অন্যান্য শর্ত আলাদা। তাই বিদেশে পড়তে যাওয়ার আগে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা টিউশন ফি নয়, সংশ্লিষ্ট দেশের শিক্ষার্থী হিসেবে কাজের নিয়মও জেনে নেওয়া জরুরি।
নিচে এমন ১০টি ইউরোপীয় দেশের কথা তুলে ধরা হলো, যেখানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ পেতে পারেন।
১. আইসল্যান্ড
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি উন্নত জীবনযাত্রা ও শিক্ষাব্যবস্থার কারণে আইসল্যান্ড আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য। ২০২৬ সালে দেশটির নিয়মে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে বৈধ শিক্ষার্থী আবাসন অনুমতিপত্রধারীরা আলাদা ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই পড়াশোনার সময় সর্বোচ্চ পূর্ণকালীন কাজের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কাজ করতে পারেন। নির্ধারিত একাডেমিক বিরতিতে পূর্ণকালীন কাজের সুযোগও রয়েছে।
২. নরওয়ে
উচ্চমানের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশের জন্য নরওয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন/ইইএ এর বাইরের শিক্ষার্থীরা সাধারণত সেমিস্টারে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা এবং ছুটির সময়ে পূর্ণকালীন কাজ করতে পারেন। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মপরিবেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও তৈরি হয়।
৩. আয়ারল্যান্ড
ইংরেজিভাষী পরিবেশের কারণে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে আয়ারল্যান্ড বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও রেসিডেন্স পারমিশন থাকা নন-ইইএ শিক্ষার্থীরা শিক্ষাকালীন সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা এবং নির্ধারিত ছুটিতে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে পারেন। তবে পার্ট-টাইম কাজ দিয়ে পুরো পড়াশোনার খরচ চালানো বাস্তবসম্মত নয়, এটি মূলত জীবনযাত্রার ব্যয়ে সহায়তা করতে পারে।
৪. ডেনমার্ক
উন্নত জীবনমান, আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি ও গবেষণার সুযোগ ডেনমার্ককে ইউরোপের উল্লেখযোগ্য স্টাডি ডেস্টিনেশনে পরিণত করেছে। তৃতীয় দেশের শিক্ষার্থীরা সাধারণত পড়াশোনার সময় গড়ে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন এবং নির্দিষ্ট সময়ে পূর্ণকালীন কাজের সুযোগ রয়েছে।
৫. যুক্তরাজ্য
বিশ্বের খ্যাতনামা বহু বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাজ্যে অবস্থিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে দেশটি বরাবরই জনপ্রিয়। নির্দিষ্ট ধরনের পূর্ণকালীন ডিগ্রি কোর্সে থাকা শিক্ষার্থীরা সাধারণত টার্ম চলাকালে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। তবে কোর্সের ধরন ও ভিসার শর্ত অনুযায়ী কাজের অনুমতিতে পার্থক্য থাকতে পারে।
৬. সুইডেন
শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সুইডেন ইউরোপের অন্যতম পরিচিত দেশ। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টার আইনি সীমা নেই। তবে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সন্তোষজনক অগ্রগতি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পড়াশোনার সঙ্গে কাজের ভারসাম্য রাখার বিষয়টি শিক্ষার্থীর নিজের পরিকল্পনার ওপরও অনেকটা নির্ভর করে।
৭. স্পেন
উষ্ণ আবহাওয়া, তুলনামূলক বৈচিত্র্যময় জীবনযাপন এবং ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশ স্পেনকে শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগও রয়েছে। OECD এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৩০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন।
৮. জার্মানি
ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ জার্মানি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য। নন-ইইউ শিক্ষার্থীদের কাজের ক্ষেত্রে বর্তমানে বার্ষিক কর্মদিবসভিত্তিক নিয়ম রয়েছে। সাধারণভাবে ১৪০ পূর্ণদিন বা ২৮০ অর্ধদিন পর্যন্ত কাজের সুযোগ থাকে। ফলে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব।
৯. বেলজিয়াম
ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশের কারণে বেলজিয়ামেও বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ রয়েছে। তৃতীয় দেশের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাকালীন সময়ে সাধারণত সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন এবং নির্দিষ্ট ছুটির সময়ে কর্মঘণ্টার সীমা আরও শিথিল হতে পারে।
১০. লুক্সেমবার্গ
ছোট দেশ হলেও উচ্চ জীবনমান, আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশ ও বহুভাষিক সমাজের কারণে লুক্সেমবার্গ শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয়। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনার সময়ে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৫ ঘণ্টা কাজের সুযোগ রয়েছে। কর্মঘণ্টার সীমা অন্য কিছু দেশের তুলনায় কম হলেও আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেশটির অন্যতম আকর্ষণ।
পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ কতটা লাভজনক?
ইউরোপে পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম কাজ শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার কিছু ব্যয় সামলাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্মপরিবেশ, ভাষা, যোগাযোগ দক্ষতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। তবে শুধু পার্ট-টাইম আয়ের ওপর নির্ভর করে বিদেশে পড়াশোনার পুরো খরচ চালানোর পরিকল্পনা করা ঝুঁকিপূর্ণ। আয়ারল্যান্ডের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সহায়তা সংস্থাও জানিয়েছে, পার্ট-টাইম কাজ জীবনযাত্রার ব্যয়ে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু পুরো পড়াশোনার খরচ বহনের জন্য এটি যথেষ্ট নয়।
তাই ইউরোপে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং বা টিউশন ফি দেখার পাশাপাশি ভিসার শর্ত, কাজের অনুমতি, কর্মঘণ্টা, কর, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।



