উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের আরও বেশি আকৃষ্ট করতে শিক্ষার্থী ভিসানীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, কোরীয় ভাষায় নির্দিষ্ট মাত্রার দক্ষতা অর্জন করতে পারলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ ছাড়াই ভিসার আবেদন করার সুযোগ পেতে পারেন। পাশাপাশি পড়াশোনার সময় খণ্ডকালীন কাজ এবং ডিগ্রি অর্জনের পর সর্বোচ্চ তিন বছর দেশটিতে থাকার সুযোগও বাড়তে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন এই পরিকল্পনায় ভাষাগত দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মসংস্থানের প্রস্তুতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশটির সরকারের লক্ষ্য, বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সাথে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে দ্য ইকোনমিক টাইমস।
ভিসার আবেদনে আর্থিক প্রমাণের শর্ত শিথিল হতে পারে
প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, কোরীয় ভাষা দক্ষতা পরীক্ষায় (টপিক) লেভেল ৪ অথবা কোরিয়ান ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ইন্টিগ্রেশন প্রোগ্রামে (কেআইআইপি) লেভেল ৪ অর্জনকারী শিক্ষার্থীরা আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পেতে পারেন।
তবে সবার জন্য এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। যেসব শিক্ষার্থীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দক্ষিণ কোরিয়ায় অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ছাড় সীমিত হতে পারে। এ ছাড়া পড়াশোনার চেয়ে চাকরির প্রতি বেশি আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ আর্থিক জামানত বা নিরাপত্তা আমানত ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
পার্টটাইম কাজের জন্য প্রয়োজন হবে ভাষাজ্ঞান
দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করতে আগ্রহীদের জন্যও ভাষাগত দক্ষতার শর্ত নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পার্টটাইম কাজের অনুমতি পেতে শিক্ষার্থীদের টপিক লেভেল ৩ অর্জন করতে হতে পারে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফলাফল ও একাডেমিক অগ্রগতিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
অর্থাৎ দেশটিতে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে চাইলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াই যথেষ্ট হবে না। কোরীয় ভাষা শেখার পাশাপাশি ভালো ফলাফল ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পড়াশোনা শেষে সর্বোচ্চ তিন বছর থাকার সুযোগ
নতুন পরিকল্পনার অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো, উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর বিদেশি শিক্ষার্থীদের দেশটিতে থাকার সময় বাড়ানো।প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের কোরীয় ভাষায় দক্ষতা এবং চাকরির প্রস্তুতির ভিত্তিতে স্নাতক শেষে এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত থাকার অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
এ ছাড়া বিদেশি স্নাতকদের সাথে দক্ষিণ কোরিয়ার যোগাযোগ বজায় রাখতে 'কোরিয়ান স্টাডি অ্যালামনাই ভিজিটর ভিসা' নামে নতুন একটি ভিসা চালুর বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞান, প্রকৌশল, উৎপাদনশিল্প ও বিশেষায়িত কারিগরি বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেতে পারেন। নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করলে দক্ষ কর্মীদের জন্য ই-৭ ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা বিশেষ সুবিধা পেতে পারেন।
বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪ লাখে নেওয়ার লক্ষ্য
দক্ষিণ কোরিয়া ২০২৭ সালের মধ্যে তিন লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে ৩ লাখ ১৪ হাজারে পৌঁছায়। এবার এই সংখ্যা চার লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে দেশটির সরকার।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আইন মন্ত্রণালয় বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসাব্যবস্থা সহজ ও কার্যকর করার জন্য একটি পরামর্শক পরিষদের সুপারিশ সামনে এনেছে। উচ্চশিক্ষা ও অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত এই পরিষদের নেতৃত্বে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত আইনমন্ত্রী জিনসু লি।
ইংরেজি মাধ্যমে পড়তে আগ্রহীদের জন্য কী সুযোগ?
নতুন পরিকল্পনায় কোরীয় ভাষার দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় শুধু ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করতে আগ্রহীদের জন্য কিছুটা বাড়তি প্রস্তুতির প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষ করে ভিসায় আর্থিক ছাড় এবং পার্টটাইম কাজের সুবিধা পেতে নির্ধারিত ভাষার স্তর অর্জন করতে হবে। ফলে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার পরিকল্পনা থাকলেও কোরীয় ভাষা শেখার বিষয়টি উপেক্ষা করা কঠিন হতে পারে।
তবে দেশটিতে ইংরেজি মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। ৭০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হাজারেরও বেশি বিভাগে ইংরেজিতে ডিগ্রি অর্জনের ব্যবস্থা রয়েছে। তাই কোরীয় ভাষায় উচ্চপর্যায়ের দক্ষতা না থাকলেও আগ্রহীরা এসব বিভাগে ভর্তির সুযোগ খুঁজতে পারেন।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য দক্ষিণ কোরিয়াকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটির সরকার। প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো কার্যকর হলে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা শেষে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মজীবন গড়ে তোলার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে নতুন নিয়ম চূড়ান্তভাবে কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিদ্যমান ভিসানীতিই অনুসরণ করতে হবে।


