...|...|...

সারাদেশ

আহত ছেলের স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করছেন মা

খুলনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৬ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ২:২৪ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১১:৪০
Shares
আহত ছেলের স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করছেন মা

আহত ছেলের চিকিৎসা ব্যয় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন সুফিয়া বেগম। ছবি: টাইমস টুডে

একসময় খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের প্রধান ফটকেই রঙিন হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে সংসারের হাল ধরেছিলেন ছেলে। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই থামিয়ে দেয় তার জীবিকার পথ। সেই পথেই এখন হাঁটছেন মা। আহত ছেলের স্বপ্ন, চিকিৎসার ব্যয়, ছোট ছেলের লেখাপড়া আর সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন সুফিয়া বেগম। প্রতিদিন হাসপাতালের গেট ও আউটডোরে ঘুরে ঘুরে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউটডোরে কথা হয় সুফিয়া বেগমের সাথে। মাথায় রোদের তাপ, বৃষ্টিতে ভিজেও হাতে রঙিন হাওয়াই মিঠাইয়ের প্যাকেট। সকাল থেকে হাসপাতালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে হাঁটছেন তিনি। চিকিৎসা নিতে আসা শিশু, স্বজন কিংবা পথচারীদের কাছে মাত্র ২০ টাকায় বিক্রি করছেন একটি করে হাওয়াই মিঠাই।

সুফিয়া বেগমের বাড়ি খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার হাজিগ্রামে। স্বামী মুজিবর শেখ। সংসারে দুই ছেলে। বড় ছেলে সুমন শেখ (২০) দীর্ঘদিন ধরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গেটে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করতেন। সেই আয়েই চলত পুরো পরিবার।

কিন্তু গত রমজান মাসে বিক্রি শেষে বাড়ি ফেরার পথে নতুন রাস্তায় একটি সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন সুমন। দুর্ঘটনায় তার ডান পা ভেঙে যায়। এরপর থেকে শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা। পরিবারের সঞ্চয় বলতে যা ছিল, সবই শেষ হয়ে যায় চিকিৎসার পেছনে।

সুফিয়া বেগম জানান, ছেলের চিকিৎসায় ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেনি সুমন। ফলে আগের মতো কাজে ফিরতে পারছে না।

চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ নিয়েই তিনি বলেন, সকাল থেকে হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা হয়ে যায়। কিন্তু থামলে তো সংসার চলবে না। ঘরে আহত ছেলে, ছোট ছেলের লেখাপড়া সবই তো এই মিঠাই বিক্রির টাকার ওপর নির্ভর করছে।

ছেলের দুর্ঘটনার পর থেকেই সংসারের হাল ধরেছেন সুফিয়া। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত হাসপাতালের প্রধান ফটক, আউটডোর এবং আশপাশের এলাকায় ঘুরে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করেন। প্রতিটি প্যাকেটের দাম ২০ টাকা। কোনো দিন বিক্রি ভালো হলে বাজার করা যায়, আবার কোনো দিন বিক্রি কম হলে দুশ্চিন্তা নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়।

তিনি বলেন, যেদিন বিক্রি ভালো হয়, সেদিন মনে হয় আল্লাহ মুখ তুলে তাকিয়েছেন। আর যেদিন বিক্রি কম হয়, সেদিন খুব চিন্তা হয় ছেলের ঔষধ কিনব কীভাবে, সংসার চলবে কীভাবে।

অভাবের মধ্যেও ছোট ছেলে জিসাদকে (৯) স্কুলে পাঠাচ্ছেন তিনি। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া জিসাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাক, এমনটা কোনোভাবেই চান না এই মা।

সুফিয়া বলেন, আমি কষ্ট করে হলেও ছেলেকে লেখাপড়া শেখাতে চাই। ও যেন আমাদের মতো কষ্ট না করে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যস্ত প্রাঙ্গণে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চিকিৎসার জন্য আসেন। সেই ভিড়ের মধ্যেই রঙিন হাওয়াই মিঠাই হাতে হাঁটতে দেখা যায় সুফিয়া বেগমকে। অনেকের কাছে এটি হয়তো মাত্র ২০ টাকার একটি মিঠাই। কিন্তু একজন মায়ের কাছে প্রতিটি বিক্রি মানে আহত ছেলের চিকিৎসার জন্য কয়েকটি টাকা, ছোট সন্তানের স্কুলের খরচ আর একটি পরিবারের নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই।