ভারতের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারে স্টারলিংকের প্রবেশাধিকার নিয়ে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানির শিবিরের সাথে ইলন মাস্কের দ্বন্দ্ব নতুন মোড় নিয়েছে। স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক সম্প্রতি আম্বানির সমর্থকদের যুক্তিগুলোকে ‘হাস্যকর’ ও ‘ভণ্ডামিতে ভরা’ বলে তীব্র আক্রমণ করেছেন।
রবিবার (১১ অক্টোবর) সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন মার্কিন এই ধনকুবের।
মাস্কের বিরোধিতার মূলে কী?
মাস্কের অভিযোগ, আম্বানির সমর্থকেরা স্টারলিংক নিয়ে সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী ও ভিত্তিহীন যুক্তি দিয়ে আস চলেছেন। একদিকে তাদের দাবি—ভারতের বাজারে সস্তা ইন্টারনেটের যুগে স্টারলিংক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না; আবার অন্যদিকে তারাই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, স্টারলিংক বাজারে এলে বড় ধরনের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবে। এই দ্বিমুখী অবস্থানকে চরম ভণ্ডামি বলে আখ্যায়িত করেছেন স্পেসএক্স প্রধান।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, স্টারলিংক ভারতে কার্যক্রম শুরু করলে গ্রাহকদের সামনে ইন্টারনেট সেবার বিকল্প অনেক বেড়ে যাবে। এতে হয়তো রিলায়েন্সের ব্যবসায় মুনাফায় কিছুটা ভাটা পড়তে পারে, তবে তাতে তাদের ব্যবসা লাটে উঠবে না। মাস্কের মতে, স্টারলিংকের সেবা যদি সত্যিই অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হয়, তবে সাধারণ গ্রাহক তা কিনবে না। সে ক্ষেত্রে স্পেসএক্সকে টিকে থাকতে হলে সেবার মূল্য অবশ্যই প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে।
ভারতের ডিজিটাল বাজারে জিও-র একচ্ছত্র আধিপত্যের বিপরীতে স্টারলিংক মূলত প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। মাস্কের দাবি, দেশের বহু অঞ্চলে এখনো নির্ভরযোগ্য সংযোগ না থাকায় কোমলমতি শিশুরা ডিজিটাল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের পণ্যের প্রসার ঘটাতে পারছেন না। এছাড়া যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে প্রচলিত টেলিকম নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়লেও স্টারলিংক যোগাযোগ সচল রেখে জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আম্বানিকে নিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও রাজনৈতিক অনুদানের প্রসঙ্গ
এই ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে সম্প্রতি আম্বানিকে সরাসরি আক্রমণ করে বসেছেন মাস্ক। গত শুক্রবার এক্স হ্যান্ডলে মুকেশ আম্বানিকে ব্যঙ্গ করে ‘প্রাইম মিনিস্টার আম্বানি’ বা প্রধানমন্ত্রী আম্বানি বলে সম্বোধন করেন তিনি। বিদ্রূপের সুরে মাস্ক প্রশ্ন তোলেন, আম্বানি কি আদতেই ভারতে স্টারলিংককে স্বাধীনভাবে ব্যবসার সুযোগ দেবেন? নাকি তিনি নিজের একচেটিয়া বাজার ধরে রাখতে নানা ফন্দি আঁটবেন।
এরপর শনিবার আরও এক ধাপ এগিয়ে রিলায়েন্স গ্রুপের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণার কথিত যোগসূত্র নিয়ে কয়েকটি পুরোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট শেয়ার করেন মাস্ক।
এর মধ্যে ২০২২ সালের আল জাজিরার একটি প্রতিবেদন ছিল, যেখানে রিলায়েন্সের অর্থপুষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফেসবুকে বিজেপির রাজনৈতিক প্রচারণা জোরদার করার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। পাশাপাশি, ২০২৪ সালের ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি প্রতিবেদনে রিলায়েন্স-সংশ্লিষ্ট ‘কুইক সাপ্লাই’ নামের একটি কোম্পানির মাধ্যমে নির্বাচনী বন্ডে মোটা অঙ্কের অনুদান দেওয়ার বিষয়টিও তিনি সামনে আনেন। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটি বিজেপিকে ৩৮৫ কোটি রুপি এবং শিবসেনাকে ২৫ কোটি রুপি অনুদান দিয়েছিল। তবে মাস্কের এই ধারাবাহিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আক্রমণের বিপরীতে রিলায়েন্স করপোরণের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
ভারতের টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
এই টানাপোড়েনের মাঝেই ভারতের কেন্দ্রীয় যোগাযোগমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়া ব্যবসা করার লাইসেন্স বা সুযোগ দেওয়া হবে না। তিনি জানান, স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড বা ইন্টারনেট সেবার জন্য ইতিমধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—ইলন মাস্কের স্টারলিংক, রিলায়েন্স জিওর স্যাটেলাইট উইং ‘জিও স্যাটকম’ এবং ভারতী এয়ারটেল সমর্থিত ‘ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব’। তবে লাইসেন্স পেলেও বাজার দখলের আগে প্রত্যেক সংস্থাকে কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল এবং অন্যান্য আইনি ধাপ সফলভাবে পার করতে হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রাহকদের সামনে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বিকল্প উন্মুক্ত রাখা। শেষ পর্যন্ত কোন প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা নেওয়া উচিত, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার থাকবে সাধারণ গ্রাহকেরই। এছাড়া ই-কমার্স জায়ান্ট আমাজনের ‘প্রজেক্ট কুইপার’-ও ভারতের এই সম্ভাবনাময় স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারে প্রবেশের জন্য জোরালো আগ্রহ প্রকাশ করেছে।


