যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি শিশুকে নিজের মহাকাশ গবেষণা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক কোম্পানি স্পেসএক্সের একটি করে শেয়ার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ ঘোষণা দেন। তবে কীভাবে শেয়ার বিতরণ করা হবে, কারা এর আওতায় আসবে এবং এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, এক্সে মাস্ক লিখেছেন, “আগামী বছর আমি আমেরিকার প্রতিটি শিশুকে আমার স্পেসএক্স শেয়ারের একটি করে শেয়ার দেব। এটি কেবল শুরুর ধাপ।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পেসএক্সের মূল্য বর্তমানে ২ ট্রিলিয়ন ডলার। জুনে কোম্পানিটি প্রথমবারের মতো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়, যা ইতিহাসের বৃহত্তম প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শুক্রবার বাজার বন্ধ হওয়ার সময় কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল প্রায় ১৪৬ ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১৮ বছরের কম বয়সী প্রায় ৭ কোটি ৩০ লাখ শিশু-কিশোর রয়েছে। বর্তমান শেয়ারদর অনুযায়ী, প্রত্যেককে একটি করে শেয়ার দেওয়া হলে সম্ভাব্য উপহারের মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। তবে এত বিপুলসংখ্যক শিশুর মধ্যে কীভাবে শেয়ার বিতরণ করা হবে কিংবা সব শিশুই এ সুবিধা পাবে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
তরুণ প্রজন্মকে শেয়ারবাজারে যুক্ত করার উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস’ নামে একটি ফেডারেল সঞ্চয় ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার আওতায় লাখ লাখ শিশুকে যুক্ত করেছে। এ ব্যবস্থায় ২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত জন্ম নেওয়া শিশুরা এককালীন ১ হাজার ডলার সরকারি অনুদান পাওয়ার যোগ্য হবে।
এর আগে জুলাইয়ে স্পেসএক্সের প্রেসিডেন্ট গুইন শটওয়েল ও তার স্বামী ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারা ট্রাম্প অ্যাকাউন্টসের আওতায় থাকা প্রায় ২০ লাখ শিশুকে স্পেসএক্সের একটি করে শেয়ার দান করবেন। এ ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশু এবং টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তারা। স্পেসএক্সের সদর দপ্তর টেক্সাসে অবস্থিত।
মাস্কের এই ঘোষণা এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের একটি উদ্যোগের পর। রোববার কোম্পানিটি জানায়, তাদের মোট শেয়ারের অন্তত ৫ শতাংশ একটি ‘পাবলিক বেনিফিট ফান্ডে’ জমা দেওয়া হবে। কোম্পানিটির সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, এর পরিমাণ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার।
অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, এ তহবিল থেকে অলাভজনক সংস্থাগুলোকে বড় অঙ্কের অনুদান দেওয়া হতে পারে অথবা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দেওয়া হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মানুষের কর্মসংস্থানে সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায়ও এ অর্থ সহায়তা করতে পারে।
অ্যানথ্রোপিকের ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় মাস্ক এক্সে লেখেন, “আমি শেয়ারগুলো সরাসরি জনগণের হাতে তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিই... আমি নিজেও ঠিক এটাই করব।”
২০১২ সালে মাস্ক ‘গিভিং প্লেজ’ নামের একটি উদ্যোগে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে বিশ্বের ধনকুবেররা জীবদ্দশায় অথবা উইলের মাধ্যমে নিজেদের সম্পদের বড় একটি অংশ দাতব্য কাজে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
মাস্কের দাতব্য সংস্থা ‘মাস্ক ফাউন্ডেশন’ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মহাকাশ অনুসন্ধান এবং শিশুস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণাসহ বিভিন্ন খাতে অনুদান দিয়ে থাকে। গত বছর নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ ফাউন্ডেশনটির সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। তবে ওই বছর ফাউন্ডেশনটির অনুদানের বড় অংশ মাস্কের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত সংস্থাগুলো পেয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দাতব্য কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মাস্ক। গত বছর ‘পিপল বাই ডব্লিউটিএফ’ পডকাস্টে তিনি বলেন, তার ফাউন্ডেশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমনভাবে অর্থ ব্যয় করা, যা প্রকৃতপক্ষে মানুষের উপকারে আসে। ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত হওয়ার জন্য অর্থ দান করা সহজ হলেও প্রকৃত উপকারের জন্য অর্থ ব্যয় করা কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২০২১ সালে মাস্ক বলেছিলেন, তিনি ৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের টেসলা শেয়ার বিক্রি করে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিতে দান করবেন, যদি সংস্থাটি দেখাতে পারে কীভাবে এ অর্থ দিয়ে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। তবে ওই অর্থ দানের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলো তাদের প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে রয়েছে। এআইয়ের কারণে ব্যাপক কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণের সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে মাস্ক ও অ্যানথ্রোপিকের উদ্যোগ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।



