কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এক নারীর বুকফাটা কান্নার ভিডিও। আগুনের ভয়াবহতার মধ্যে স্বজনকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে বারবার তিনি বলছেন, ‘আমার সাইফকে আইন্না দাও।’ তার এই আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশের পরিবেশ। ভিডিওটি দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন অনেকে।
কেউ তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউ হয়তো নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু স্বজনকে খুঁজে ফেরা ওই নারীর আকুতির কাছে যেন সব সান্ত্বনাই অসহায়। তার কণ্ঠে বারবার ফিরে আসছে একই আবেদন-‘আমার সাইফকে আইন্না দাও।’ প্রিয়জনের খোঁজে তার এই ব্যাকুলতা অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতার পাশাপাশি সামনে এনেছে স্বজন হারানোর শঙ্কায় মুহ্যমান একটি পরিবারের অসহায় মুহূর্ত।
জানা গেছে, দুর্গাপূজার ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন ওই নারী। আনন্দ আর অবসর কাটানোর প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হওয়া সেই ভ্রমণ মুহূর্তেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। তিনি একজন সাংবাদিকের বোন বলেও জানা গেছে। তবে সাইফ ওই নারীর কে হন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনের ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন।
এর আগে ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দোলন আচার্য ঘটনাস্থল থেকে ১০টি লাশ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন। ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টটিতে ১৭ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তিরা সবাই পর্যটক।
সকাল ৮টা থেকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ কার্যক্রমে সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর রিসোর্টটিতে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। ভয়াবহ আগুনে রিসোর্টটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল রহমান জানান, আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে উপজেলা প্রশাসন, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ কাজ করেছে।
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের লোকজন সেখান থেকে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। তাদের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
টুপটুপ রিসোর্টের সেই আগুন শুধু একটি স্থাপনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, কেড়ে নিয়েছে ১০টি প্রাণ, আহত করেছে আরও ছয়জনকে এবং বহু পরিবারের জীবনে নামিয়ে এনেছে অপূরণীয় শোকের ছায়া। আর সেই ভয়াবহতার মধ্যে এক নারীর কণ্ঠে ভেসে আসা ‘আমার সাইফকে আইন্না দাও’ আকুতি যেন স্বজনকে ফিরে পাওয়ার এক অসহায় আবেদন।
প্রিয়জনের খোঁজে ব্যাকুল একজন মানুষের এই আর্তনাদ মনে করিয়ে দেয়-একটি দুর্ঘটনার ক্ষতি শুধু প্রাণহানি কিংবা সম্পদের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সাথে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও পরিবারের ভবিষ্যৎ। আগুনের সেই বিভীষিকার পর সাইফের কী হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। অনিশ্চয়তার এই মুহূর্তে ওই নারীর আকুতি যেন একটাই প্রশ্ন সামনে আনে-যে মানুষটিকে তিনি খুঁজছেন, তার কী খবর?


