কুমিল্লায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জমিতে রিসোর্ট নির্মাণের উদ্যোগ নিলেই বাধা দিতেন যুবদলকর্মী মো. আবু কাউছার ও তার বন্ধু শামীম হোসেন-এমন তথ্য জানিয়েছেন জমি নিয়ে বিরোধের ঘটনায় গ্রেফতার তৌহিদ। পুলিশের ভাষ্য, এ বিরোধের জেরে কাউছারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। জমি নিয়ে বিরোধ মীমাংসায় বৈঠকের কথা থাকলেও তার আগেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় তৌহিদ ও তার বড় ভাই তানজিলকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন, যে জমি নিয়ে বিরোধ, সেটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের। গ্রেফতার তৌহিদ জানিয়েছেন, ওই জমিতে তারা যখনই রিসোর্ট করতে যেতেন, তখনই শামীম ও তার বন্ধু কাউছার বাধা দিতেন। এ থেকেই বিরোধের সূত্রপাত। এ নিয়ে শুক্রবার রাতে মীমাংসা বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তার আগেই সকালে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তৌহিদ ও তার ভাইসহ অন্যরা হামলা চালান। এতে আবু কাউছার নিহত হন।
শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লার গোমতী নদীর উত্তর পাড়ের ছত্রখিল এলাকায় কাউছারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর ২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় তৌহিদকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং তার বড় ভাই তানজিলকে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গ্রেফতার করেছে। শুক্রবার গভীর রাতে কুমিল্লা নগরের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের নূরপুর এলাকা থেকে তৌহিদকে আটক করা হয়। এ সময় উত্তেজিত জনতা তাকে মারধর করে। পরে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ও ডিবির সদস্যরা তাকে নিজেদের হেফাজতে নেন। একই রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তানজিলকে আটক করে এসআরবি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৪৩ বছর বয়সী তৌহিদের বিরুদ্ধে দুটি হত্যাসহ সাতটি মামলা রয়েছে। তার বড় ভাই ৪৭ বছর বয়সী তানজিলের বিরুদ্ধে রয়েছে একটি মামলা। তারা কুমিল্লা সদর উপজেলার আমড়াতলি ইউনিয়নের নন্দিবাজার এলাকার খোরশেদ আলমের ছেলে।
নিহত আবু কাউছারের বয়সও ৪৩ বছর। তিনি কুমিল্লা নগরের কাপ্তান বাজার বেপারী পুকুর পাড় এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। স্থানীয়ভাবে নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি।
নিহতের বন্ধু শামীম হোসেন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জমি নিয়ে বিরোধ মীমাংসার কথা বলে শুক্রবার তাদের ডেকে নেন তৌহিদ। শামীম, কাউছারসহ তিন থেকে চারজন একটি অটোরিকশায় ঘটনাস্থলে যান। তাদের পেছনে আরেকটি অটোরিকশায় আরও কয়েকজন আসছিলেন। তবে কাউছারকে বহনকারী অটোরিকশাটি আগে পৌঁছে যায়। এরপরই তৌহিদের নেতৃত্বে তাদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন শামীম। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তৌহিদ ধারালো দা দিয়ে কাউছারের গলা ও ঘাড়ে কোপ দেন। এতে তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। এ সময় দুটি মোটরসাইকেলে করে তৌহিদ ও তানজিলসহ চারজন পালিয়ে যান বলে দাবি করেন তিনি।
শামীমের সাথে নন্দিবাজার এলাকার তৌহিদ ও তানজিলের ছত্রখিল এলাকার একটি জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। শামীমের দাবি, তিনি জমিটি কিনেছিলেন। তবে জমির দখল নিতে বাধা দেওয়া হচ্ছিল। তার অভিযোগ, কেনা জমিতে প্রবেশের পথ বন্ধ করে সামনের মসজিদের খাস জায়গা দখল করে কফিশপ চালাচ্ছিলেন তৌহিদরা। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল।
কুমিল্লা মহানগর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খলিলুর রহমান (বিপ্লব) জানান, আবু কাউছার আগে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সদস্য ছিলেন। বর্তমানে তিনি নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বড় ভাই কবির হোসেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সহসভাপতি। তারা সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা মনিরুল হক সাক্কুর অনুসারী।
খলিলুর রহমান অভিযোগ করেন, হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার তৌহিদ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তিনি আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন খলিলুর রহমান। তার ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তৌহিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। ওই মামলায় ঢাকায় গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি ছয় মাস কারাগারে ছিলেন।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, তৌহিদ ও তানজিলকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। নিহতের পরিবার মামলা করেছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করতে অভিযান চলছে।


