প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে বদলে যাচ্ছে বিশ্বের কর্মবাজার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় আগামী কয়েক বছরে কিছু পেশায় কর্মীর চাহিদা কমতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের সাথে যুক্ত পেশাগুলোতে এর প্রভাব বেশি পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’- এ ২০২৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক চাকরির বাজারের সম্ভাব্য পরিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বের ৫৫টি অর্থনীতির এক হাজারের বেশি নিয়োগদাতার মতামতের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে কয়েকটি পেশাকে দ্রুত কমতে থাকা চাকরির তালিকায় রাখা হয়েছে।
পোস্টাল সার্ভিস ক্লার্ক
চিঠির পরিবর্তে ই-মেইল ও অন্যান্য ডিজিটাল যোগাযোগের ব্যবহার বাড়ায় ডাকসেবার কিছু প্রচলিত কাজের চাহিদা কমছে। WEF- এর পূর্বাভাসেও পোস্টাল সার্ভিস ক্লার্কদের দ্রুত কমতে থাকা পেশার তালিকার শীর্ষে রাখা হয়েছে।
ব্যাংক টেলার
অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং ও স্বয়ংক্রিয় সেবার বিস্তারের কারণে ব্যাংকের শাখায় নিয়মিত লেনদেনের জন্য গ্রাহকদের সরাসরি কর্মীর ওপর নির্ভরতা কমছে। এ কারণে ব্যাংক টেলার ও সংশ্লিষ্ট ক্লারিক্যাল পদের চাহিদাও কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে WEF।
ডাটা এন্ট্রি ক্লার্ক
তথ্য ইনপুট, তথ্য স্থানান্তর ও নথি সাজানোর মতো পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সফটওয়্যার ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে করা সম্ভব হচ্ছে। তাই ডাটা এন্ট্রি ক্লার্কদের কর্মসংস্থানও আগামী কয়েক বছরে কমতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্যাশিয়ার ও টিকিট ক্লার্ক
সেলফ-চেকআউট, ডিজিটাল পেমেন্ট ও স্বয়ংক্রিয় টিকিটিং ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে ক্যাশিয়ার ও টিকিট ক্লার্কদের কিছু দায়িত্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করা যাচ্ছে। ফলে এই পেশাগুলোতেও কর্মীর প্রয়োজন কমার পূর্বাভাস রয়েছে।
প্রশাসনিক সহকারী ও নির্বাহী সচিব
অফিস ব্যবস্থাপনার অনেক রুটিন কাজ এখন ডিজিটাল সফটওয়্যার ও এআইভিত্তিক টুলের মাধ্যমে করা সম্ভব। ই-মেইল ব্যবস্থাপনা, সময়সূচি তৈরি ও বিভিন্ন নথি প্রস্তুতের মতো কাজে অটোমেশন বাড়ায় প্রশাসনিক সহকারী ও নির্বাহী সচিবের মতো পদের চাহিদা কমতে পারে।
প্রিন্টিং ও সংশ্লিষ্ট পেশা
ডিজিটাল কনটেন্টের বিস্তার এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থার কারণে প্রিন্টিং ও সংশ্লিষ্ট কিছু কাজেও পরিবর্তন আসছে। WEF- এর তালিকায় printing and related trades workers- কে দ্রুত কমতে থাকা পেশাগুলোর মধ্যে রাখা হয়েছে।
হিসাবরক্ষণ ও পেরোলের কিছু কাজ
অ্যাকাউন্টিং, বুককিপিং ও পেরোলের নিয়মিত কাজের বড় অংশ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে এই ক্ষেত্রের কিছু রুটিনভিত্তিক পদের কর্মসংস্থান কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে WEF।
টেলিমার্কেটার
গ্রাহকের সাথে যোগাযোগ ও প্রচারণার কিছু কাজ এখন স্বয়ংক্রিয় কলিং সিস্টেম, চ্যাটবট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে করা যায়। WEF- এর দ্রুত কমতে থাকা পেশার তালিকায় টেলিমার্কেটারদেরও রাখা হয়েছে।
তবে এসব পেশা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে- এমন কথা বলছে না WEF। বরং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে এসব কাজে কর্মীর চাহিদা কমে যেতে পারে। একই সাথে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর পেশার চাহিদাও বাড়বে।
WEF- এর হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে। একই সময়ে বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি স্থানচ্যুত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে নতুন চাকরির সংখ্যা কমে যাওয়া চাকরির চেয়ে বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদনে বিগ ডাটা, ফিনটেক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং এবং সফটওয়্যার উন্নয়নের মতো প্রযুক্তিনির্ভর পেশাকে দ্রুত বাড়তে থাকা কাজের মধ্যে রাখা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।



