যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রফতানিতে আগস্টে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একক মাস হিসেবে গত আগস্টে দেশটিতে পোশাক রফতানি বেড়েছে ২৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ মাসিক প্রবৃদ্ধি।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে ৮১৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ। গত অর্থবছরের একই মাসে রফতানির পরিমাণ ছিল ৬৫০ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ডলার।
চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে মোট ১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ রফতানি ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি।
এ দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির মাসিক গড় দাঁড়িয়েছে ৮০৬ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট রফতানিকে ১২ মাসের গড় হিসেবে ধরলে মাসিক গড় ছিল ৬৪৫ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ নতুন অর্থবছরের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রফতানি থেকে বাংলাদেশের গড় আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে আগস্টের শক্তিশালী রফতানির কারণে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ০৯ শতাংশ।
এর মধ্যে তৈরি পোশাক থেকেই এসেছে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ পোশাকের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ প্রায় ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে।
পোশাকের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক ও মেলামাইন, টেক্সটাইল ও সুতা, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল পণ্য এবং জুতা।
পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের মতে, আগামী মাসগুলোতেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
দেশের পোশাকশিল্পের অন্যতম উদ্যোক্তা ও এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, শীতকালীন পোশাকের অর্ডার দেওয়ার শেষ সময় হওয়ায় আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক নানা সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা রয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
আগামী মাসগুলোতে আগের তুলনায় ভালো অর্ডার পাওয়ার কথা জানিয়ে ফজলুল হক বলেন, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ও ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। উদ্যোক্তারা সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন।
তার মতে, প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ এবং সরকারের নীতি-ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে এই সুযোগ আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির যে গতি, তা আশাব্যঞ্জক। এই গতি আগামী ১২ মাস অব্যাহত থাকলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আয় ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার। তাই সেখানে রফতানি বাড়াতে পণ্যের বৈচিত্র্য, উচ্চমূল্য সংযোজন ও মানোন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানিসহ অন্যান্য ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বাড়াতে ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি এসব খাতে রফতানি বাড়াতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি আরও বৈচিত্র্যময় হতে পারে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানি আয় ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। নতুন অর্থবছরের শুরুতে তৈরি পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি এবং আগস্টে ২৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেশটির বাজারে বাংলাদেশের রফতানির সম্ভাবনাকে আরও সামনে এনেছে।


