সৌদি আরবে গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল জানিয়েছে, এ বিষয়ে আগে থেকে তাদের কিছু জানানো হয়নি। ঘটনাটি সৌদিতে বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিচারপ্রক্রিয়া এবং কনস্যুলার সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এনেছে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির পরিচয় প্রকাশ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। তারা হলেন নাজরুল ইসলাম আবদুল বশির এবং সিটি আখতার, যিনি সুইটি আখতার নামেও পরিচিত।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের পর থেকে সৌদি আরবে অন্তত ১৯ জন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ১৬ জন, ২০২৪ সালে একজন এবং ২০২৬ সালের অক্টোবরে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে এসব তথ্য থেকে পুরো সময়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিশ্চিত হওয়া যায় না।
রিপ্রিভ ও ইউরোপীয় সৌদি মানবাধিকার সংস্থার যৌথ প্রতিবেদন এবং পরবর্তী সময়ের পর্যবেক্ষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদন ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে পাওয়া এ সংখ্যা সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সামগ্রিক চিত্র নয়।
১২ বছরে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড
রিপ্রিভ ও ইউরোপীয় সৌদি মানবাধিকার সংস্থার যৌথ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। এতে ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ১২ বছরে সৌদি আরবে মোট ১ হাজার ২৪৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাদের মধ্যে ১৬ জন ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক। এ সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৯০ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৩৯ শতাংশ।
বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, অভিবাসী শ্রমিকদের অনেকের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করা কঠিন হতে পারে। আরবি ভাষায় পরিচালিত আদালতের কার্যক্রম বুঝতেও তাদের সমস্যা হতে পারে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়তে পারেন তারা।
ওই সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বিদেশিদের মধ্যে পাকিস্তান, ইয়েমেন, সিরিয়া, মিসর ও বাংলাদেশের নাগরিকেরা ছিলেন।
২০১১ সালে আট বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২০১১ সালের অক্টোবরে। সে সময় ডাকাতির সময় এক মিসরীয় নিরাপত্তারক্ষীকে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত আট বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
রিয়াদে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এ ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই আট বাংলাদেশি হলেন মামুন আবদুল মান্নান, ফারুক জামাল, সুমন মিয়া, মোহাম্মদ সুমন, শফিক আল-ইসলাম, মাসউদ শামসুল হক, আবু আল-হুসাইন আহমেদ এবং মুতির আল-রহমান।
২০২৪ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ৩৪৫ জনের
ইউরোপীয় সৌদি মানবাধিকার সংস্থার ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সৌদি আরবে ৩৪৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাদের মধ্যে ১৩৮ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। এ তালিকায় একজন বাংলাদেশিও ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালে দেশটিতে ১৭২ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৪ সালে এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়।
মাদকসংক্রান্ত অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বাড়তে থাকায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো সমালোচনা করে। তাদের উদ্বেগের অন্যতম বিষয় ছিল মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক ব্যবহার।
অক্টোবরে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড
সৌদি প্রেস এজেন্সির মাধ্যমে প্রকাশিত দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক’ কাজ করার অভিযোগে ওই দুই ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এ অপরাধে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ইসলামী আইনের ‘তাআজির’ বিধান অনুযায়ী তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এ বিধানে নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি নির্ধারণের ক্ষমতা বিচারকের হাতে থাকে।
তবে এ ঘটনায় বাংলাদেশি কনস্যুলেটকে আগে থেকে জানানো হয়নি বলে জানিয়েছে জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল। বিষয়টি বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের মুখে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা ও কনস্যুলার সহায়তার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
২০২৫ সালে সৌদিতে রেকর্ডসংখ্যক মৃত্যুদণ্ড
সৌদি আরবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বেড়েছে। ইউরোপীয় সৌদি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে ৩৪৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে রেকর্ড ৩৫৬ জনে দাঁড়ায়।
এসব পরিসংখ্যানে শুধু বাংলাদেশি নাগরিক নন, বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সৌদি আরবে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক কাজ করেন। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির বসবাস ও কর্মসংস্থানের কারণে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রবণতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে, বিদেশে অভিযুক্ত বাংলাদেশিদের বিচারপ্রক্রিয়ায় ন্যায্যতা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়া এবং কনস্যুলার যোগাযোগ বজায় রাখার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।

