যে বয়সে মায়ের কোলে নিশ্চিন্তে বেড়ে ওঠার কথা, একটু একটু করে পৃথিবীকে চেনার কথা, সেই বয়সেই জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে ১৪ মাসের শিশু জুনান চাকমা। জন্মের পর থেকেই হৃদ্যন্ত্রে জটিল সমস্যা নিয়ে বেড়ে উঠছে সে। চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার হৃদ্যন্ত্রে পাঁচটি ছিদ্র এবং রক্তনালিতে আরও তিনটি সমস্যা রয়েছে। সব মিলিয়ে আটটি জটিল সমস্যায় আক্রান্ত শিশুটির চিকিৎসা নিয়ে উদ্বিগ্ন তার পরিবার। অস্ত্রোপচার ও উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন প্রায় ১০ লাখ টাকা। কিন্তু দরিদ্র পরিবারটির পক্ষে এই অর্থের সংস্থান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
রাঙামাটি পৌরসভার ভেদভেদী এলাকার বাসিন্দা জুনানের বাবা রিপন চাকমা ও মা রুমা চাকমা। দিন এনে দিন খাওয়া পরিবারটির অভাব যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করতে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কাজ করেন রিপন চাকমা। দিনভর পরিশ্রম করে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে চলে সংসার। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থ জোগাড় করতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, জুনানকে ঢাকার ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে চিকিৎসা করানো হয়েছে। সেখানকার চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুটির শারীরিক অবস্থা জটিল। যত দ্রুত সম্ভব তার অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করতে হবে। উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নেওয়া সম্ভব হলে ভালো হবে বলেও পরামর্শ দিয়েছেন তারা। চিকিৎসকদের এই পরামর্শের পর থেকেই ছেলেকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করছেন রিপন ও রুমা। কিন্তু আর্থিক সংকট তাদের সেই চেষ্টার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাত্র ১৪ মাস বয়সী জুনানের শরীর এতটাই দুর্বল যে মায়ের বুকের দুধ খেতেও কষ্ট হয় তার। যে বয়সে শিশুর হাসি-আনন্দে মুখর থাকার কথা একটি পরিবার, সেই বয়সেই সন্তানের অসুস্থতা ঘিরে মা-বাবার দিন কাটছে দুশ্চিন্তায়। নিজের সন্তানকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখে অসহায় হয়ে পড়েছেন মা রুমা চাকমা। ছেলেকে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন দেখলেও প্রতিনিয়ত তাকে ভাবতে হচ্ছে সন্তানের জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়ে।
রুমা চাকমার ইচ্ছা, অন্য মায়েদের মতো তিনিও সন্তানকে কোলে নিয়ে হাসবেন, তার মুখে হাসি দেখবেন, একটু একটু করে বড় হতে দেখবেন। কিন্তু বাস্তবতা যেন প্রতিদিনই তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, ছেলেকে সুস্থ করে তুলতে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। অথচ সংসারের নিত্যদিনের খরচ মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে প্রায় ১০ লাখ টাকা জোগাড় করা তার পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
জুনানের বাবা রিপন চাকমার প্রতিটি দিন কাটে জীবিকার সন্ধানে। পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কাজ করতে হয় তাকে। দিন শেষে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। কিন্তু সন্তানের অসুস্থতার কারণে তার দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। একজন বাবা হিসেবে তিনি চান, তার সন্তান সুস্থ হয়ে উঠুক এবং অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠুক। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে সেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারছেন না।
একদিকে সন্তানের দ্রুত অস্ত্রোপচারের তাগিদ, অন্যদিকে অর্থের অভাব—সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তায় কাটছে পরিবারটির প্রতিটি দিন। কীভাবে এত টাকা জোগাড় করবেন, কোথায় পাবেন চিকিৎসার খরচ, সময়মতো চিকিৎসা করাতে পারবেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন রিপন চাকমা ও রুমা চাকমা।
জুনানের মা রুমা চাকমা বলেন, “আমার সন্তান জন্মের পর থেকেই হার্টের সমস্যায় ভুগছে। চিকিৎসকেরা বলেছেন, তার হার্টে পাঁচটি ছিদ্র রয়েছে, রক্তনালিতেও তিনটি সমস্যা আছে। যত দ্রুত সম্ভব অপারেশন করাতে হবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। দেশের বাইরে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারলে ভালো হবে। কিন্তু আমরা খুব গরিব মানুষ। আমার স্বামী মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। অনেক সময় নিজেদের খাবারের ব্যবস্থাটুকু করতেও কষ্ট হয়। সেখানে এত টাকা কোথায় পাব? আমার সন্তান এতটাই দুর্বল যে ঠিকমতো বুকের দুধও খেতে পারে না। ছেলের কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না। আমি শুধু চাই, আমার সন্তানটা বেঁচে থাকুক। সবাই যদি একটু সহযোগিতা করেন, তাহলে হয়তো আমার ছেলেটাকে বাঁচানোর একটা সুযোগ পাব।”
একজন মায়ের এই আকুতি যেন অসহায় হৃদয়ের গভীর আর্তনাদ। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা কিংবা তাকে বাঁচানোর ইচ্ছার কোনো অভাব নেই। অভাব শুধু সামর্থ্যের। যে মা নিজের সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চান, সেই মাকেই আজ ছেলের চিকিৎসার জন্য অন্যের সহযোগিতার প্রত্যাশায় থাকতে হচ্ছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, জুনানের অস্ত্রোপচার যত দ্রুত সম্ভব করানো প্রয়োজন। তাই সময় নষ্ট না করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে চান তারা। কিন্তু প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতে সংগ্রাম করা পরিবারটির পক্ষে অল্প সময়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা সংগ্রহ করা কঠিন। তাদের আশঙ্কা, অর্থের অভাবে চিকিৎসা পিছিয়ে গেলে সন্তানের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ অবস্থায় জুনানের চিকিৎসায় সমাজের হৃদয়বান মানুষ, সামর্থ্যবান ব্যক্তি, বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করছে পরিবারটি। তাদের আশা, মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় ছেলের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।
মাত্র ১৪ মাসের জুনান জানে না, তার জীবন বাঁচানোর জন্য মা-বাবা কতটা অসহায় অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন। সে জানে না, তার চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে বাবাকে কতটা সংগ্রাম করতে হচ্ছে। সে শুধু মায়ের কোলে একটু স্বস্তি নিয়ে বাঁচতে চায়, অন্য শিশুদের মতো সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে চায়।
একটি শিশুর জীবন বাঁচানোর লড়াই শুধু তার মা-বাবার একার লড়াই হওয়া উচিত নয়। সামর্থ্যবান মানুষের সামান্য সহযোগিতাও এমন একটি পরিবারের জন্য বড় আশার কারণ হতে পারে। জুনান চাকমার চিকিৎসার জন্য এখন প্রয়োজন মানবিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো। যে বাবা মানুষের বাড়িতে কাজ করে পরিবারের খাবার জোগাড় করেন, সেই বাবার আজ একটাই চাওয়া-কেউ যেন তার সন্তানকে বাঁচানোর লড়াইয়ে পাশে দাঁড়ান। যে মা সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চান, তার সেই স্বপ্ন যেন অর্থের অভাবে হারিয়ে না যায়।


