স্তন ক্যানসারের কথা উঠলেই অধিকাংশ মানুষের মনে নারীদের কথা আসে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, পুরুষেরও স্তন ক্যানসার হতে পারে। মোট স্তন ক্যানসারের প্রায় ১ শতাংশ পুরুষের মধ্যে শনাক্ত হয়। রোগটি তুলনামূলক বিরল হলেও সচেতনতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে ধরা পড়ে। ফলে চিকিৎসা জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।
পুরুষের স্তনে কোনো অস্বাভাবিক চাকা, বোঁটার পরিবর্তন কিংবা অস্বাভাবিক তরল নিঃসরণ দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার ফল ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
পুরুষেরও কি স্তনের টিস্যু থাকে?
হ্যাঁ। জন্মের সময় নারী ও পুরুষ উভয়ের শরীরেই স্তনের টিস্যু থাকে। বয়ঃসন্ধিকালে ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে নারীদের স্তন বিকশিত হয়। অন্যদিকে, পুরুষের শরীরে এই টিস্যু সাধারণত অনুন্নত অবস্থায় থাকে।
তবে স্তনের টিস্যু অনুন্নত থাকলেও সেখানে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটতে পারে। আর সেই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণেই পুরুষের স্তন ক্যানসার হতে পারে।
কতটা বিরল পুরুষের স্তন ক্যানসার?
স্তন ক্যানসারের মোট রোগীর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ১ শতাংশ। সাধারণত বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে এ রোগ বেশি শনাক্ত হয়। বিশেষ করে ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সের মধ্যে ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। তবে কম বয়সেও এ রোগ হতে পারে।
পুরুষের স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা তুলনামূলক কম। অনেকেই জানেন না, স্তনের টিস্যুতে ক্যানসার হতে পারে। ফলে স্তনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলেও অনেকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে দেরি করেন।
কেন হয় পুরুষের স্তন ক্যানসার?
পুরুষের স্তন ক্যানসারের একক কোনো কারণ নেই। জিনগত বৈশিষ্ট্য, হরমোনের ভারসাম্য, বয়স এবং কিছু শারীরিক অবস্থার কারণে এ রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
১. বংশগত ও জিনগত কারণ
পরিবারে স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে পুরুষের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে BRCA2 জিনে মিউটেশন বা পরিবর্তন এ রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিনগত ঝুঁকির কারণ। BRCA1 জিনের পরিবর্তনও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
২. হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
পুরুষের শরীরেও অল্প পরিমাণে ইস্ট্রোজেন হরমোন তৈরি হয়। ইস্ট্রোজেনের মাত্রা তুলনামূলক বেড়ে গেলে কিংবা টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা থাকলেই ক্যানসার হবে, এমন নয়।
৩. ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম
এটি একটি জিনগত অবস্থা, যেখানে পুরুষের শরীরে অতিরিক্ত একটি এক্স ক্রোমোজোম থাকে। এর ফলে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম এবং ইস্ট্রোজেনের মাত্রা তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এ কারণে আক্রান্ত পুরুষদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি সাধারণ পুরুষদের তুলনায় বেশি।
৪. স্থূলতা
শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমলে চর্বিকোষের মাধ্যমে পুরুষ হরমোন অ্যান্ড্রোজেন থেকে ইস্ট্রোজেন তৈরির পরিমাণ বাড়তে পারে। ফলে স্থূলতা স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
৫. যকৃতের রোগ
লিভার বা যকৃতের গুরুতর রোগ, বিশেষ করে সিরোসিস, শরীরে হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এর ফলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৬. বয়স বৃদ্ধি
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মধ্যবয়স পেরোনো পুরুষদের মধ্যে এ রোগ শনাক্ত হয়।
৭. বুকে বিকিরণ চিকিৎসার ইতিহাস
আগে অন্য কোনো রোগের চিকিৎসায় বুকে রেডিয়েশন বা বিকিরণ থেরাপি নেওয়া থাকলে পরবর্তী সময়ে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৮. অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থা
অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন যকৃতের কার্যক্ষমতা ও হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া অণ্ডকোষের কিছু রোগ বা হরমোনজনিত সমস্যাও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে এসব ঝুঁকির কারণ থাকলেই যে কারও স্তন ক্যানসার হবে, তা নয়। আবার কোনো পরিচিত ঝুঁকির কারণ না থাকলেও এ রোগ হতে পারে।
পুরুষের স্তন ক্যানসারের লক্ষণ কী?
পুরুষের স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে কয়েকটি লক্ষণ বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যেমন-
# স্তনে বা স্তনের বোঁটার নিচে শক্ত চাকা বা পিণ্ড তৈরি হওয়া, যা অনেক সময় ব্যথাহীন থাকে।
# স্তনের বোঁটা ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া বা আকৃতির পরিবর্তন।
# বোঁটা থেকে রক্তমিশ্রিত কিংবা অন্য ধরনের তরল বের হওয়া।
# বোঁটা বা আশপাশের ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, খসখসে হওয়া কিংবা ঘা তৈরি হওয়া।
# স্তনের ত্বকে কুঁচকে যাওয়া বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেওয়া।
# বগলে লিম্ফ নোড বা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া।
এসব লক্ষণ দেখা দিলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। তবে লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
স্তনে চাকা হলেই কি ক্যানসার?
না। পুরুষের স্তনে চাকা বা স্তন বড় হয়ে যাওয়ার একটি সাধারণ কারণ হলো গাইনেকোমাস্টিয়া। হরমোনের পরিবর্তন, কিছু ওষুধ কিংবা অন্যান্য শারীরিক অবস্থার কারণে এ সমস্যা হতে পারে। এতে স্তনের টিস্যু বড় হয় এবং কখনো ব্যথা বা স্পর্শকাতরতা দেখা দিতে পারে।
গাইনেকোমাস্টিয়া সাধারণত ক্যানসার নয়। তবে স্তনের কোনো চাকা ক্যানসারজনিত কি না, তা শুধু দেখে বা স্পর্শ করে নিশ্চিত হওয়া যায় না। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করাতে হয়।
কেন দেরিতে ধরা পড়ে রোগ?
পুরুষের স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা কম থাকায় অনেকেই প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেন না। কেউ কেউ মনে করেন, স্তন ক্যানসার কেবল নারীদের রোগ। আবার স্তনে পরিবর্তন দেখা দিলে লজ্জা বা সংকোচের কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতেও দেরি করেন অনেকে।
এ ছাড়া পুরুষের স্তনের টিস্যু তুলনামূলক কম হওয়ায় ক্যানসার কখনো কখনো আশপাশের ত্বক বা অন্যান্য টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে রোগ কত দ্রুত ছড়াবে, তা ক্যানসারের ধরন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
স্তন ক্যানসারের সন্দেহ হলে চিকিৎসক প্রথমে শারীরিক পরীক্ষা করেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী ম্যামোগ্রাম, আল্ট্রাসাউন্ড কিংবা অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে।
ক্যানসার নিশ্চিত করতে সাধারণত বায়োপসি করা হয়। এ পদ্ধতিতে সন্দেহজনক স্থান থেকে সামান্য টিস্যু নিয়ে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয়। ক্যানসার শনাক্ত হলে রোগের পর্যায়, কোষের বৈশিষ্ট্য এবং হরমোন রিসেপ্টরের অবস্থা নির্ণয় করে চিকিৎসার পরিকল্পনা করা হয়।
পুরুষের স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা কী?
রোগের পর্যায়, ক্যানসারের ধরন এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। চিকিৎসায় এক বা একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে।
অস্ত্রোপচার: আক্রান্ত স্তনের টিস্যু অপসারণ করা হতে পারে। প্রয়োজনে বগলের লিম্ফ নোডও পরীক্ষা বা অপসারণ করা হয়।
রেডিয়েশন থেরাপি: ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে নির্দিষ্ট স্থানে বিকিরণ প্রয়োগ করা হয়।
কেমোথেরাপি: ওষুধের মাধ্যমে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা বা তাদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
হরমোন থেরাপি: হরমোন-সংবেদনশীল ক্যানসারের ক্ষেত্রে ট্যামোক্সিফেনের মতো ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে।
টার্গেটেড থেরাপি: ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ দেওয়া হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসা নিতে দেরি না করাই গুরুত্বপূর্ণ।
ঝুঁকি কমাতে ও সচেতন থাকতে করণীয়
পুরুষের স্তন ক্যানসার প্রতিরোধের কোনো নিশ্চিত উপায় নেই। তবে কিছু পদক্ষেপ সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
স্তনে চাকা, বোঁটার পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক তরল নিঃসরণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
পরিবারে স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসককে জানান। প্রয়োজন অনুযায়ী জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন। অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন এড়িয়ে চলুন।
যকৃতের রোগ বা হরমোনজনিত সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিন।
সচেতনতাই পারে বাড়াতে বাঁচার সম্ভাবনা
স্তন ক্যানসার শুধু নারীদের রোগ- এমন ধারণা পুরুষদের সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদিও পুরুষের স্তন ক্যানসার তুলনামূলক বিরল, তবু এর লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
স্তনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে লজ্জা বা সংকোচ নয়, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হওয়া উচিত প্রথম পদক্ষেপ। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সুযোগ বাড়ে, আর সেই সচেতনতাই হতে পারে জীবন রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।


