...|...|...

লাইফস্টাইল

সারাদিন পারলেও রাতের বেলা কেন মনকে শাসন করা যায় না?

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১২:৪৩
Shares
সারাদিন পারলেও রাতের বেলা কেন মনকে শাসন করা যায় না?

ছবি: সংগৃহীত

দিনভর কাজের ব্যস্ততা, মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা, নানা দায়িত্ব আর ছোটাছুটির মধ্যে সময় কেটে যায়। কিন্তু রাত নামতেই যেন বদলে যায় মনের অবস্থা। পুরোনো স্মৃতি ফিরে আসে, প্রিয় মানুষের কথা বেশি মনে পড়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ে। কখনো সামান্য কোনো ঘটনা ঘুম কেড়ে নেয়, আবার কখনো কাউকে ফোন করা, পুরোনো বার্তা পড়া কিংবা আবেগের বশে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদ তৈরি হয়।

দিনের বেলায় যে মনকে সহজেই সামলে রাখা যায়, রাতের নীরবতায় সেই মনকেই কেন এত অস্থির মনে হয়? এর পেছনে কি শুধু একাকিত্ব, নাকি রয়েছে মস্তিষ্কের কার্যক্রম ও শরীরের জৈবিক ঘড়ির ভূমিকা?

বিজ্ঞান বলছে, রাতের আবেগের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। ঘুমের ঘাটতি, মানসিক ক্লান্তি, চিন্তার পুনরাবৃত্তি এবং দিনের ব্যস্ততা কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো মনের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে সবার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাটি এক রকম নয়।

রাতের নীরবতায় কেন বাড়ে চিন্তা?

দিনের বেশির ভাগ সময় মানুষকে নানা কাজে মনোযোগ দিতে হয়। পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা, পরিবার কিংবা সামাজিক যোগাযোগের কারণে মস্তিষ্ক ব্যস্ত থাকে। ফলে ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা বা আবেগ নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সুযোগ তুলনামূলক কম হতে পারে।

রাতে কাজের চাপ কমে গেলে বাইরের মনোযোগও কমে যায়। তখন দিনের বেলায় উপেক্ষা করা চিন্তা, অপূর্ণ ইচ্ছা, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা পুরোনো স্মৃতি সামনে চলে আসতে পারে।

মনোবিজ্ঞানে একই নেতিবাচক চিন্তা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভাবার প্রবণতাকে বলা হয় রুমিনেশন। যেমন, কেউ দিনের বেলায় কারও কথায় কষ্ট পেয়েছেন। ব্যস্ততার কারণে বিষয়টি নিয়ে ভাবার সুযোগ পাননি। রাতে বিছানায় যাওয়ার পর সেই কথোপকথন বারবার মনে পড়তে থাকে। তিনি ভাবতে থাকেন, কেন এমন বলা হলো, অন্যভাবে উত্তর দেওয়া যেত কি না, কিংবা ভবিষ্যতে সম্পর্কের কী হবে।

এভাবে একই ঘটনা নিয়ে বারবার ভাবলে সমস্যার সমাধান না হয়ে উল্টো মানসিক অস্বস্তি বাড়তে পারে। গবেষণায় চিন্তার এই পুনরাবৃত্তির সাথে ঘুমের সমস্যার সম্পর্কও পাওয়া গেছে। 

মস্তিষ্কের ক্লান্তি কি আবেগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে?

আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স পরিকল্পনা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তাৎক্ষণিক তাড়না সামলানোর মতো কাজে যুক্ত। অন্যদিকে অ্যামিগডালা আবেগগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বা সম্ভাব্য হুমকির সংকেত শনাক্ত করার সাথে সম্পর্কিত।

পর্যাপ্ত বিশ্রাম না হলে মস্তিষ্কের মনোযোগ, বিচারবোধ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। ফলে ক্লান্ত অবস্থায় কোনো ঘটনা নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো কিংবা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ঘুমের ঘাটতি ও আবেগের সম্পর্ক নিয়ে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা ও মেটা বিশ্লেষণে ১৫৪টি গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, ঘুম কম হওয়া বা ঘুমের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার সাথে ইতিবাচক অনুভূতি কমে যাওয়া এবং উদ্বেগের লক্ষণ বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। তবে নেতিবাচক আবেগের সব ধরনের পরিবর্তন সব গবেষণায় একই রকম ছিল না। 

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। রাত হলেই মস্তিষ্ক আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, এমন নয়। বরং সারাদিনের ক্লান্তি, অপর্যাপ্ত ঘুম ও ব্যক্তির মানসিক অবস্থার কারণে রাতে আবেগ সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

শরীরের জৈবিক ঘড়িরও কি ভূমিকা আছে?

মানবদেহের ভেতরে রয়েছে একটি জৈবিক ঘড়ি, যা প্রায় ২৪ ঘণ্টার ছন্দে ঘুম, জেগে থাকা, শরীরের তাপমাত্রা এবং বিভিন্ন হরমোনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এই ছন্দকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম।

আলো ও অন্ধকার এই ঘড়ির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। সন্ধ্যার দিকে অন্ধকার বাড়লে শরীরে মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়তে শুরু করে। এটি শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে সংকেত দেয়। অন্যদিকে দিনের আলো জাগ্রত থাকার স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সাহায্য করে।

তবে জৈবিক ঘড়ি মূলত ঘুম ও জেগে থাকার ছন্দ পরিচালনা করে। এটি সরাসরি এমন কোনো নিয়ম তৈরি করে না যে রাত হলেই মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়বে। রাতের অনুভূতি বদলে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ঘুমের সময়সূচি এবং মানসিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ।

রাতেই কেন বেশি মনে পড়ে প্রিয় মানুষকে?

দিনের বেলায় কারও সাথে কথা বলার ইচ্ছা হলেও কাজের ব্যস্ততায় হয়তো তা প্রকাশ করা হয় না। কিন্তু রাতে একা হলে সেই মানুষটির কথা বারবার মনে পড়তে পারে। পুরোনো ছবি দেখা, আগের কথোপকথন পড়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কার্যক্রম অনুসরণ করার প্রবণতাও বাড়তে পারে।

এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, নীরব পরিবেশে মনোযোগ বাইরের কাজ থেকে সরে নিজের অনুভূতির দিকে যায়। তখন ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, অভিমান কিংবা অপূর্ণ প্রত্যাশার মতো আবেগগুলো বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

একাকিত্বও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। দিনের বেলায় মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া গেলেও রাতে যোগাযোগ কমে গেলে কারও কারও মধ্যে শূন্যতা তৈরি হয়। সেই অনুভূতি থেকে পুরোনো সম্পর্কের কথা মনে পড়তে পারে কিংবা কাউকে বার্তা পাঠানোর তাগিদ তৈরি হতে পারে।

তবে রাতের বেলায় কাউকে বেশি মনে পড়লেই যে সেই সম্পর্কের প্রতি অনুভূতি আরও গভীর হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কখনো এটি ভালোবাসার প্রকাশ, কখনো অভ্যাস, আবার কখনো নিঃসঙ্গতা বা অসমাপ্ত চিন্তার ফল হতে পারে।

রাতে কেন ছোট সমস্যাও বড় মনে হয়?

রাতের নীরবতায় কোনো সমস্যা নিয়ে দীর্ঘ সময় ভাবতে থাকলে সেটিকে বাস্তবের চেয়ে বড় মনে হতে পারে। বিশেষ করে উদ্বেগপ্রবণ ব্যক্তিরা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নেতিবাচক ঘটনা নিয়ে একের পর এক চিন্তা করতে পারেন।

ধরা যাক, দিনের বেলায় কর্মক্ষেত্রে কোনো ভুল হয়েছে। তখন হয়তো বিষয়টি সংশোধনের সুযোগ রয়েছে বলে মনে হয়েছে। কিন্তু রাতে সেই ভুলের পরিণতি নিয়ে ভাবতে ভাবতে মনে হতে পারে, চাকরিই হারাতে হবে। অথচ বাস্তবে এমন কিছু ঘটার নিশ্চয়তা নেই।

এ ধরনের চিন্তায় একটি সমস্যা হলো, মানুষ সম্ভাবনাকে অনেক সময় নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করেন। চিন্তা যত ঘুরতে থাকে, উদ্বেগও তত বাড়তে পারে। এতে ঘুম আসতে দেরি হয়। আবার ঘুম কম হলে পরের দিন আবেগ সামলানো আরও কঠিন হতে পারে। এভাবে একটি চক্র তৈরি হয়। 

রাতের বেলায় আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়া কেন ঠিক নয়?

গভীর রাতে কাউকে ফোন করা, পুরোনো সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, রাগের মাথায় বার্তা পাঠানো কিংবা হঠাৎ কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছা তৈরি হতে পারে। আবেগের মুহূর্তে এসব কাজ স্বস্তি দেবে বলে মনে হলেও পরে অনুশোচনা তৈরি হতে পারে।

কারণ, তীব্র আবেগের সময় মানুষ অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক স্বস্তিকে বেশি গুরুত্ব দেন। কিন্তু সিদ্ধান্তটির দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি বিবেচনা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে যখন তিনি ক্লান্ত বা ঘুমবঞ্চিত।

এ কারণে রাতে কোনো বিষয় নিয়ে তীব্র আবেগ তৈরি হলে সাথে সাথে সিদ্ধান্ত না নিয়ে কিছুটা সময় নেওয়া উপকারী হতে পারে। আবেগ কমে গেলে একই পরিস্থিতি অন্যভাবে দেখা সম্ভব হয়।

রাতের অস্থিরতা সামলাবেন যেভাবে

১. চিন্তা লিখে রাখুন

মাথায় একই চিন্তা বারবার এলে কাগজে লিখে ফেলুন। কী নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে এবং পরদিন তার কোন অংশের সমাধান করা সম্ভব, তা আলাদা করে লিখুন। এতে সমস্যাটিকে কিছুটা গুছিয়ে দেখা যায়।

২. আবেগের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখুন

রাতে খুব রাগ, কষ্ট বা একাকিত্ব অনুভব করলে সাথে সাথে বার্তা পাঠানো কিংবা বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। প্রয়োজন হলে লিখে রাখুন, কিন্তু পরদিন আবার পড়ে দেখুন।

৩. ঘুমের নির্দিষ্ট সময় বজায় রাখুন

প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত ঘুম মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

৪. ঘুমের আগে পর্দা থেকে দূরে থাকুন

ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় মুঠোফোন ব্যবহার করলে উজ্জ্বল আলো এবং উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়বস্তু ঘুমের প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই ঘুমের আগে কিছুটা সময় মুঠোফোন থেকে দূরে থাকা ভালো।

৫. শরীরকে শান্ত করার চেষ্টা করুন

ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া, হালকা বই পড়া, শান্ত পরিবেশে বসে থাকা কিংবা পরদিনের কাজ গুছিয়ে রাখার মতো অভ্যাস মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। চিন্তা জোর করে বন্ধ করার চেষ্টা না করে চিন্তাটি এসেছে, সেটি স্বীকার করে মনোযোগ অন্যদিকে ফেরানোর চেষ্টা করুন।

৬. প্রয়োজন হলে কথা বলুন

রাতের চিন্তা যদি কোনো সম্পর্ক, পারিবারিক সমস্যা কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ থেকে আসে, তাহলে বিশ্বস্ত কারও সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা উপকারী হতে পারে। উদ্বেগ, মন খারাপ বা ঘুমের সমস্যা নিয়মিত হলে এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মনকে শাসন নয়, বোঝার চেষ্টা জরুরি

সারাদিন নিজের আবেগ সামলে রাখতে পারলেও রাতে তা কঠিন মনে হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। দিনের ব্যস্ততা কমে যাওয়া, একাকিত্ব, একই চিন্তা বারবার ফিরে আসা, মানসিক ক্লান্তি এবং ঘুমের ঘাটতি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

তবে মনকে নিয়ন্ত্রণ করার অর্থ সব অনুভূতি চেপে রাখা নয়। কষ্ট, অভিমান, ভয় কিংবা ভালোবাসা মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। এগুলোকে অস্বীকার না করে অনুভূতির কারণ বোঝা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় কী করা হবে, সে বিষয়ে সচেতন হওয়াই বেশি কার্যকর।

রাতের কোনো চিন্তা খুব সত্যি বা জরুরি মনে হলেও সেটির ভিত্তিতে সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন নেই। কখনো একটু বিশ্রাম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং পরদিনের পরিষ্কার মনই একই পরিস্থিতিকে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করতে পারে।