বাংলাদেশে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি পাচ্ছেন ধনী মানুষেরা। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো এসব সুবিধার বাইরে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে মাত্র ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সরাসরি সুবিধা পান। অর্থাৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
অন্যদিকে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে ৩১ শতাংশ সরাসরি সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পান।
সুবিধার আর্থিক পরিমাণেও বৈষম্যের চিত্র দেখা গেছে। দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ বছরে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পান। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ১০ হাজার ৪৭২ টাকা।
বিদ্যুৎ ভর্তুকিতেও এগিয়ে ধনীরা
বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন ধনী মানুষ। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ মোট বিদ্যুৎ ভর্তুকির ১৫ শতাংশের কিছু বেশি পান।
অন্যদিকে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষ পান মোট ভর্তুকির প্রায় ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাতে সরকারের দেওয়া ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই যাচ্ছে সমাজের ওপরের ২০ শতাংশ মানুষের কাছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, যারা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তারা স্বাভাবিকভাবেই ভর্তুকির সুবিধাও বেশি পান। ফলে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান ভর্তুকি কাঠামোতে ধনী জনগোষ্ঠীর সুবিধা তুলনামূলক বেশি।
ফ্যামিলি কার্ডে দরিদ্রদের কাছে পৌঁছানোর তাগিদ
প্রতিবেদনে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে দারিদ্র্য কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, প্রচলিত পদ্ধতিতে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দেওয়া হলে বছরে প্রায় ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারেন।
তবে প্রকৃত দরিদ্র মানুষকে সঠিকভাবে শনাক্ত করে কার্ডের সুবিধা দেওয়া গেলে বছরে প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তোলা সম্ভব বলে মনে করে সংস্থাটি।
এ জন্য দারিদ্র্য নির্ধারণে স্বীকৃত মানদণ্ড ব্যবহার, নগদ সহায়তার প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করা, খাদ্যসহায়তার তালিকা পুনর্বিন্যাস এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সমন্বয়ের সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক।
সারের ভর্তুকি বেড়েছে চার গুণ
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে কৃষি খাতের ভর্তুকির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সারে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার কোটি টাকা- অর্থাৎ পাঁচ বছরে চার গুণ বৃদ্ধি।
বিশ্বব্যাংক ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ কৃষকদের লক্ষ্য করে ‘কৃষক কার্ড’-এর সুবিধা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ সেবা, মাটি পরীক্ষা, বাজারজাতকরণ ও পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
বাড়ছে দারিদ্র্য
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় দেশে আরও ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। কর্মসংস্থানের স্থবিরতা এবং নারীদের চাকরি হারানোর প্রবণতাও দারিদ্র্য বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, দেশে টানা চতুর্থ বছরের মতো দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা বেড়ে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে দেশে আয়বৈষম্যও বেড়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির হিসাবে, সরকার জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করছে। তবে বিপুল এই ব্যয়ের পরও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাইরে রয়ে গেছে।


