দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই নীরব কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ। তবে মাঠের রাজনীতিতে দৃশ্যমান উপস্থিতি না থাকলেও দলটির দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
সম্প্রতি টেলিগ্রামে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর জেলাজুড়ে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঝড়।
এই অডিওকে কেন্দ্র করে জেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক শীর্ষ নেতা ফেসবুককে বানিয়েছেন একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারের প্রধান হাতিয়ার। কেউ তুলছেন দলীয় নেতৃত্বের সমালোচনা, কেউ আবার অতীতের নির্বাচন, আনুগত্য এবং আর্থিক অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগ এনে প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই অডিওতে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানকে শেখ হাসিনার সাথে কথা বলতে শোনা যায়।
সেখানে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করা হলেও, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি—বক্তব্যের একটি বড় অংশে কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র মাহবুবুর রহমানকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
অডিওতে মুজিবুর রহমান দলীয় প্রধানের উদ্দেশে বলেন, তিনি নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে তাকে জয়ী করেছেন, কিন্তু পরদিনই তার সাথে বেইমানি করা হয়েছে। আপন চাচাতো ভাইয়ের বিপক্ষে গিয়ে দলের সিদ্ধান্তে কাজ করার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখনো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ লিখছে, কিন্তু জামায়াতের বিরুদ্ধে কেউ লিখছে না। এ সময় তিনি তার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য দিল্লিতে পাঠাতে সহযোগিতা চান এবং দীর্ঘদিন ধরে চরম মানসিক চাপের মধ্যে আছেন বলেও দলীয় প্রধানকে জানান।
অডিও ফাঁসের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাবেক মেয়র মাহবুবুর রহমান নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়ে মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগের তীর ছোড়েন।
মাহবুবুর রহমান দাবি করেন, বিএনপি-জামায়াতের সাথে সমঝোতা না করায় তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে; অন্যদিকে মুজিবুর রহমানই বিএনপি-জামায়াতের সাথে আপস করে বর্তমানে দেশে অবস্থান করছেন।
সাবেক এই মেয়র আরও লেখেন, শেখ হাসিনার সাথে ইতোমধ্যে তার একাধিকবার কথা হয়েছে এবং দলীয় প্রধান সব বিষয়ে অবগত আছেন। মুজিবুর রহমান বিগত নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের বিরোধিতা করে অন্য প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন দাবি করে তিনি বলেন, এর প্রমাণ তার কাছে আছে এবং সময়মতো তা প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি গত দুই বছরে দলীয় কর্মীদের সহায়তার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগও তোলেন তিনি, যদিও এর পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য-প্রমাণ তিনি প্রকাশ করেননি।
শীর্ষ দুই নেতার এই বিরোধে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন জেলা যুবলীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও। যুবলীগ নেতা শোয়াইব ইফতেখার সাবেক মেয়র মাহবুবুর রহমানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, রাজনৈতিক সংকটের সময়ে সাবেক মেয়রই দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন। যারা নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, তাদের দলে রাখা হলে আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে শক্তিশালী হতে পারবে না।
অন্যদিকে, আরেক যুবলীগ নেতা মোনাফ সিকদারও ফেসবুক পোস্টে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে কটাক্ষ করেছেন। বিগত কয়েক দিনের ফেসবুক পোস্ট ও অনলাইন তৎপরতা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কক্সবাজার আওয়ামী লীগের ভেতরে বর্তমানে দুটি স্পষ্ট বলয় তৈরি হয়েছে। একটি অংশ মুজিবুর রহমানকে বর্তমান সংকটে দলের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নেতা হিসেবে তুলে ধরছে, আর অপর অংশটির দাবি, কক্সবাজারের তৃণমূল আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ এখনও সাবেক মেয়র মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতিই আস্থা রাখে।
সার্বিক বিষয় নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক বর্তমান ও সাবেক নেতার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও, কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমে মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফোনে যোগাযোগ করা হলে কয়েকজন নেতা শুধু বলেন যে, এ বিষয়ে তারা এই মুহূর্তে কিছু বলতে চান না। তবে যারা গণমাধ্যমে কথা বলতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন, তাদের নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টেই এই কোন্দল নিয়ে একাধিক প্রকাশ্য পোস্ট দেখা গেছে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে দলীয় কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় টেলিগ্রাম ও ফেসবুকই এখন নেতাদের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ও নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই আর দলীয় কার্যালয়ের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নিয়েছে।

