দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি জোরদার করেছে বাংলাদেশ। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত ২ দশমিক ৪ গিগাওয়াট ক্ষমতার এ প্রকল্পের দুটি ইউনিট চালু হলে জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশের বেশি পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দেশের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশের জন্য বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট চলতি বছরের শেষ নাগাদ উৎপাদনে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর পরবর্তী এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটও চালুর লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নতুন সংযোজন
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এর মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা রয়েছে। পাশাপাশি কয়লা, তেল এবং নবায়নযোগ্য উৎস থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
রূপপুরের দুই ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসে বৈচিত্র্য আসার পাশাপাশি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রূপপুরে গড়ে উঠেছে ‘রুশ পাড়া’
রূপপুর প্রকল্পের সঙ্গে শুধু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রই গড়ে ওঠেনি, বদলে গেছে আশপাশের জনপদের চিত্রও। রুশ রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের সহায়তায় নির্মাণকাজ চলায় কয়েক বছর ধরে বিপুলসংখ্যক রুশ প্রকৌশলী ও কর্মী এখানে অবস্থান করছেন।
এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও। বিভিন্ন দোকান ও প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ও রুশ ভাষার ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় খাবারের সঙ্গে কিছু রেস্তোরাঁয় যুক্ত হয়েছে রুশ খাবারও। রুশ কর্মীদের ঘিরে গড়ে ওঠা ছোট ব্যবসার মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের একটি অংশও আয়-রোজগারের সুযোগ পেয়েছেন।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ স্থানীয়দের
তবে প্রকল্প ঘিরে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি এত বড় পারমাণবিক স্থাপনা হওয়ায় অনেকের মনেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়ে গেছে।
কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৫ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে বসবাসকারী ৮০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মিলকর্মী মো. ইউনুস আলী গণমাধ্যমকে বলেন, সম্প্রতি একটি কম্প্রেসার পরীক্ষার সময় বিকট শব্দে আশপাশের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এমনকি ঘুমন্ত শিশুরাও ভয় পেয়ে জেগে ওঠে।
তার ভাষায়, নিজের জীবনের শেষ সময়ে এসে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা নেই। তবে সন্তান ও নাতি-নাতনিদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে তার উদ্বেগ রয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন পারমাণবিক দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে রূপপুরে আন্তর্জাতিক মানের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ছয় দশকের স্বপ্ন রূপ নিচ্ছে বাস্তবে
রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নতুন নয়। ষাটের দশকেই এ এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চিন্তা শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে ফ্রান্স, সৌদি আরব, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হলেও কোনো উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
দীর্ঘ আলোচনা ও নানা জটিলতা পেরিয়ে ২০১৫ সালে রাশিয়ার সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি করে বাংলাদেশ। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ রাশিয়ার ঋণ হিসেবে দেওয়ার কথা রয়েছে।
২০১৭ সালে মূল নির্মাণকাজ শুরু হলেও প্রকল্পটি নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এগোয়নি। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে কাজের গতি কমে যায়। পরে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও অর্থ লেনদেনেও নানা জটিলতা তৈরি হয়।
এর পাশাপাশি শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে রূপপুর প্রকল্প ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। তবে তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিতর্কের বাইরে মানুষের চাওয়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ
প্রকল্পের নিরাপত্তা, ব্যয়, বিলম্ব এবং রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়ে আলোচনা থাকলেও স্থানীয় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা মূলত এক জায়গায়- নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ।
লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষিকাজে সেচ দিতে সমস্যায় পড়া ৫৫ বছর বয়সী কৃষক বেলী বেগম দ্রুত রূপপুর কেন্দ্র চালুর প্রত্যাশা করছেন। তার আশা, বাড়ির কাছেই নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এলে তাদের এলাকায় বিদ্যুতের সংকট কমবে এবং মানুষ ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন।
রূপপুর তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়; দীর্ঘ ছয় দশকের প্রত্যাশা, বিপুল বিনিয়োগ, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং সাধারণ মানুষের বিদ্যুতের চাহিদা- সবকিছুর মিলিত পরীক্ষার নামও এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।

