জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) জন্য প্রয়োজনীয় ভোটার যাচাই-বাছাই ফরমে চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর পেতে দিনের পর দিন ইউনিয়ন পরিষদে ঘুরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কারও ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখার অভিযোগ, কেউ ১৪ বার পরিষদে গিয়েও স্বাক্ষর পাননি। আবার দালালের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা দিয়ে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একজনের দাবি, স্বাক্ষর না দিয়ে তার ছেলের ভোটার হওয়ার ফাইল ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
কক্সবাজারের রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হক কোম্পানির বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
তাদের কয়েকজনের দাবি, চেয়ারম্যানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়া বা তাদের সাথে পারিবারিক-সামাজিক সম্পর্ক থাকায় তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তোফাইল জানান, তার ছেলে সাগর আলীকে ভোটার করানোর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে গেলে তিনি স্বাক্ষর না দিয়ে ফাইল রেখে দেন। এক মাস পরও ফাইল বা স্বাক্ষর কোনোটিই দেওয়া হয়নি।
বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানালে তিনি ফাইলের একটি ফটোকপি দিতে বলেন। তোফাইল জানান, সেই ফাইল এখনো ফেরত পাননি। মির্জালীর দোকান এলাকার সিএনজি চালক ওয়াসিমের অভিযোগ, ছেলেকে ভোটার করানোর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে গেলে স্বাক্ষর না দিয়ে ফাইলটি ছিঁড়ে ফেলা হয়। তার ছেলে এখনো ভোটার হতে পারেনি। ওয়াসিম বলেন, আমি রোহিঙ্গা হলে আমাকে ক্যাম্পে দিয়ে আসতে বলেন। আমি তো আমার বাপ-দাদার খতিয়ানভুক্ত বাংলাদেশি নাগরিক।
চেয়ারম্যানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়াই হয়রানির কারণ দাবি করে তিনি বলেন, আমার পছন্দের প্রার্থীকে আমি ভোট দেব, এটা আমার গণতান্ত্রিক অধিকার।
১ নম্বর ওয়ার্ডের সাঈদ শিশির জানান, তিনি একটি এনজিওতে চাকরি করেন। চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে ১৪ বার পরিষদে গেলেও ভোটার যাচাই-বাছাই ফরমে স্বাক্ষর পাননি। তার অভিযোগ, চেয়ারম্যানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে তার বড় ভাই ভোট করায় তাকে হয়রানি করা হয়েছে।
৩ নম্বর ওয়ার্ডের দৌলত জানান, তার পরিবারের এক সদস্যকে ভোটার ফরমে স্বাক্ষরের জন্য প্রায় দুই মাস ঘুরতে হয়েছে। পরে দালালের মাধ্যমে টাকা দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নির্বাচন অফিসে জমা দিতে হয়েছে। কালাম নামে আরেক ব্যক্তি দাবি করেন, তার ভাই নুরুল আলমকে ভোটার করাতে দালালের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা দিয়ে চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর নিতে হয়েছে।
৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জয়নাল আবেদীন বাবুল জানান, চেয়ারম্যানের প্রতিদ্বন্দ্বী পরাজিত প্রার্থীর পরিচিত, আত্মীয়স্বজন এবং তার পক্ষে ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের হয়রানি করা হচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুল্লাহ বিদ্যুৎ বলেন, যে যার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবে, এটাই গণতন্ত্র। কিন্তু চেয়ারে বসার পর কে ভোট দিছে, কে দেয়নি, সেটা নিয়ে পড়ে থাকে।
৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গিয়াস উদ্দিন জানান, এ ধরনের অভিযোগ তিনি শুনেননি। তবে অফিস বন্ধ থাকা অবস্থায় স্বাক্ষর না নিতে বলা হয়েছে- এমন কথা শুনেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, খুনিয়াপালং ইউনিয়নে দালাল চক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অসংখ্য রোহিঙ্গা এনআইডি কার্ড পেয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো নথি বা প্রমাণ দেননি।
অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান আবদুল হক জানান, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। তিনি কাউকে হয়রানি করেননি। তার ভাষায়, কেউ যদি এরকম প্রমাণ দিতে পারে, আমি চেয়ারম্যানি ছেড়ে চলে যাব, কথা দিলাম।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান অসুস্থ থাকায় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারেননি। তবে সুস্থ হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।



