নাজমুল হাসান রাজ
কাগজে-কলমে নাম ‘আইকনিক টাওয়ার’ বা ‘বঙ্গবন্ধু ট্রাই-টাওয়ার’। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফার আদলে ৯৬ হাজার কোটি টাকায় রাজধানী ঢাকার পূর্বাচলে ১৪২ তলার টাওয়ার নির্মাণের কথা ছিল। বরাদ্দকৃত জায়গা ছিল পূর্বাচলের ১৯ নম্বর সেক্টরের সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট বা সিবিডি বাণিজ্যিক এলাকায়। তবে, শত একর জমিতে নেই অট্টালিকাসদৃশ কোনো স্থাপনা। আছে ঘন ঘাসে ভরা জঙ্গল। নেই কোনো উচ্চ ভবন, অথচ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। প্রকল্পে একটি ইটের টুকরাও গাঁথা না হলেও এক কোণে রয়েছে নকশাবহির্ভূত সিকদার গ্রুপের তিনতলা প্রকল্প ভবন।
৭ বছর চুপ থাকার পর সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ- রাজউকের। সংস্থাটি নিজেদের দায়মুক্ত করতে উপায় খুঁজছিল। চুক্তির শর্তে উল্লেখ ছিল, দুই কিস্তি পরিশোধ না করলে জমির বরাদ্দ বাতিল করতে পারবে রাজউক। সে অনুযায়ী সিকদার গ্রুপের ১০০ একর জমির বরাদ্দ বাতিল করেছে সংস্থাটি। তবে প্রশ্ন উঠেছে, ৭ বছর শর্তভঙ্গের বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা না নিলেও সরকার পরিবর্তনের পর বরাদ্দ বাতিল করে রাজউক নিজেদের ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
তথ্য বলছে, রাজধানী ঢাকার অদূরে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ১৯ নম্বর সেক্টরে সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট বা সিবিডি বাণিজ্যিক এলাকার প্রস্তাব করে রাজউক। ১০০ একর জমিতে ১১১ তলা বিশিষ্ট আইকনিক টাওয়ার নির্মাণে বিনিয়োগ ধরা হয়েছিল ৯৬ হাজার কোটি টাকা। এ নিয়ে জাতীয় চারটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। দেশি-বিদেশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ‘কনসোর্টিয়াম অব পাওয়ারপ্যাক হোল্ডিংস লিমিটেড’ ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান ‘কাজিমা কর্পোরেশন’কে বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতি একর জমি ৩০ কোটি ২৫ লাখ ১০০ টাকা হিসেবে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে বরাদ্দের ১০ শতাংশ টাকা জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। পরে বরাদ্দের বিপরীতে জমির মালিকানার আবেদন নাকচ করে রাজউক।
সরেজমিনে দেখা যায়, পূর্বাচলে ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ের কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় উন্নয়নকাজ চলছে। তবে আইকনিক টাওয়ার প্রকল্পের তেমন কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। চারপাশে দেওয়া বেড়া খুলে ফেলা হয়েছে। নেই কোনো সাইনবোর্ড। ৩০০ বিঘা জমির চারপাশ ঘুরে সবুজ ঘাস ছাড়া কিছু চোখে পড়েনি। ৭ বছরে প্রকল্প কাজে ব্যবহৃত তিনতলা ভবনটিও কালচে রূপ ধারণ করেছে। সবুজ এ ভূমিতে দিনের বেলায় গরু-ছাগল চরতে দেখা যায়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজউকের তৎকালীন প্রশাসন এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সিকদার গ্রুপের মালিকানাধীন ‘পাওয়ারপ্যাক’ ও জাপানের ‘কাজিমা’ কনসোর্টিয়ামকে একক সুবিধা পাইয়ে দিতে দরপত্রের শর্তাবলি কাটছাঁট করে।
এক কিস্তির টাকায় ৭ বছরের ‘বিনামূল্যে জমিদারি’
চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী, রাজউকের প্রথম কিস্তির টাকা ছিল ২৭০ কোটি। পরবর্তী ৭ বছরে বার্ষিক সমপরিমাণ কিস্তিতে টাকা পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। সিকদার গ্রুপ প্রথম কিস্তিতে মাত্র ২৭০ কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা দিয়ে ১০০ একর জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
আইন অনুযায়ী, প্রথম বা দ্বিতীয় বছর কিস্তি খেলাপি হলেই বরাদ্দ বাতিলের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু রাজউক গত ৭ বছর রহস্যজনক নীরবতা পালন করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে সিকদার গ্রুপ রাজউককে আর একটি টাকাও দেয়নি। অথচ নিজেদের লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে জমি দখলে রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পূর্বাচলে সাধারণ মানুষ কিস্তির টাকা দিতে মাসখানেক দেরি করলেই রাজউক নোটিশ পাঠায়, প্লট কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেয়। অথচ সিকদার গ্রুপ হাজার কোটি টাকা বাকি রেখে ৭ বছর জমি ভোগ করেছে। এই দীর্ঘ সময় রাজউকের পরিদর্শকেরা অন্ধ ছিলেন, নাকি অন্য কোনো অলিখিত সুবিধা নেওয়া হয়েছিল-এ প্রশ্ন এখন জনমনে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু ট্রাই-টাওয়ার প্রকল্পটি তিনটি ভবনের মাধ্যমে জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে মিল রেখে হওয়ার কথা ছিল। ভাষা আন্দোলনের স্মরণে ৫২ তলা ‘ল্যাঙ্গুয়েজ টাওয়ার’, মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে ৭১ তলা ‘লিবারেশন টাওয়ার’ এবং দেশের অগ্রযাত্রা বিবেচনায় ১১১ তলা ‘লিগ্যাসি টাওয়ার’ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এই ট্রাই-টাওয়ারের দৃষ্টিনন্দন নকশা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ‘হিরিম আর্কিটেক্টস’কে।
রাজউক ভালো করেই জানে, নির্ধারিত সময়ে কিস্তি না পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া বড় ধরনের অপরাধ। আইনের দায় থেকে নিজেদের কর্মকর্তাদের বাঁচাতে এবং ফাইলে নিজেদের পরিষ্কার দেখাতে তড়িঘড়ি করে বোর্ড সভা ডেকে এই বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এটি কোনো নীতিগত ব্যবস্থা নয়, বরং আইনি দায়মুক্তির কৌশল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই মেগা জালিয়াতি এবং রাজউকের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও দুর্নীতিবিরোধী বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিলুর রহমান খান বলেন, তৎকালীন সময়ে দুর্নীতি ছিল গভীরে। গত ৭ বছরে কিস্তি না দিয়ে জমি দখলে রাখা, অনুমোদনহীন ভবন নির্মাণ-সবই রাজউকের দায়। আইকনিক টাওয়ারের ক্ষেত্রে জাতীয় আবেগকে ব্যবহার করা হয়েছে। সিকদার গ্রুপের বরাদ্দ বাতিল করে রাজউক নিজেকে ‘দুধে ধোয়া তুলসী পাতা’ দাবি করতে পারে না। পাতানো নিলাম ও ৭ বছরের রহস্যজনক নীরবতার সঙ্গে জড়িত তৎকালীন চেয়ারম্যান, মেম্বার এস্টেটসহ রাঘববোয়ালদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) মাসুম আলী বেগ বলেন, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ১৯ নম্বর সেক্টরে সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট এলাকায় ১০০ একর কম-বেশি জমিতে আইকনিক টাওয়ার নির্মাণের জন্য দেওয়া বরাদ্দ শর্ত মোতাবেক দুই কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় বাতিল করা হয়েছে। শর্তভঙ্গের কারণে রাজউকের ২/২০২৬তম সভায় বরাদ্দটি চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়।

