রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনের আগে শিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ আবাসন সংকট সমাধানে একাধিক প্রতিশ্রুতি দিলেও দায়িত্ব গ্রহণের দশ মাস পরও সেগুলোর দৃশ্যমান বাস্তবায়ন হয়নি।
২০২৫ সালের রাকসু নির্বাচনে ২৪ দফা ইশতেহারে প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের বৈধ আবাসিক সিট নিশ্চিত, আবাসন সংকট সমাধানে অস্থায়ীভাবে হোস্টেল বা আবাসন ভাতা চালু, নতুন হল নির্মাণ এবং শতভাগ আবাসিকতা নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো জোটটি।
নির্বাচনে ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’-এর প্রার্থীরা ২৩টির মধ্যে ২০টিতেই রাকসুর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে জয়ী হয়ে দায়িত্ব নেন। তবে দায়িত্ব গ্রহণের দশ মাস পরও এসব প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ কিংবা অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন ভাতা চালুর মতো উদ্যোগের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
শিবির-সমর্থিত জোটের নির্বাচিত রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘আমরা আমাদের ছোট ইশতেহারগুলো পূরণ করেছি, আলহামদুলিল্লাহ। বড় বড় ইশতেহারের ক্ষেত্রে প্রশাসনের নানা বাধা রয়েছে। তবুও আমরা বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
তিনি বলেন, ‘রিডিং রুমে এসির ব্যবস্থা করাও কঠিন একটি ইশতেহার ছিল। তবুও আমরা সেটি বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করেছি। আশা করি, অন্যান্য ইশতেহারের দাবিগুলোও এভাবে আদায় করতে পারব।’
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মেহেদী হাসান বলেন, পূর্ণাঙ্গ আবাসন ও আবাসন ভাতা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ছিল।
তিনি বলেন, ‘রাকসু প্রতিনিধিরা তাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন হাউস ও বডিতে বিষয়গুলো উত্থাপন ও আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে আশানুরূপ কোনো ফলাফল আসেনি।’
মেহেদী হাসান আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে রাকসুর পক্ষ থেকে প্রশাসনের ওপর চাপ দেওয়ার পরও দৃশ্যমান সমাধান না আসায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে বিষয়টি সেভাবে স্পষ্ট হয়নি। শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা নিজেদের ব্যানারে সরাসরি প্রশাসনের কাছে দাবিগুলো তুলে ধরতে বাধ্য হয়েছি। সম্প্রতি ঘোষিত পাঁচ দফা দাবির মধ্যেও বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
শতভাগ আবাসন ব্যবস্থা স্বল্প সময়ে বাস্তবায়ন সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত একটি স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করা। আমরা জেনেছি, এ খাতে বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ রয়েছে। প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি—দ্রুত বাজেট পাস করে দৃশ্যমান কাজ শুরু করতে হবে এবং কবে, কীভাবে আবাসন সংকটের সমাধান করা হবে, তা শিক্ষার্থীদের সামনে স্পষ্ট করতে হবে।’
শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘রাকসুর শিবির প্যানেল শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং রাকসুকে ব্যবহার করে শিবির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও আর্থিক অনিয়ম করেছে।’
তবে রাকসুর কার্যক্রম নিয়ে ভিন্নমত জানিয়েছেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি ফুয়াদ রাতুল। তার দাবি, শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া আদায়ের মূল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রাকসু আবাসন সংকটসহ মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
তিনি বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া আদায়ের মূল প্ল্যাটফর্ম ছিল রাকসু। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, রাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার দায় কোনোভাবেই ছাত্রশিবির এড়াতে পারে না।’
ফুয়াদ রাতুল আরও অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিতর্ক থেকে সাধারণ মানুষের মনোযোগ সরাতেই ছাত্রশিবির সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন করে এসব দাবি সামনে এনেছে। তার ভাষ্য, রাকসুর ব্যর্থতা থেকে নিজেদের দায় আলাদা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, রাকসু যে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, তার দায় শিবিরও এড়াতে পারে না। নিজেদের বিতর্ক আড়াল করতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ভিন্নভাবে নিজেদের উপস্থাপনের চেষ্টা সাধারণ শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারছে।’
ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, নির্বাচনের আগে ‘১২ মাসে ২৪ প্রতিশ্রুতি’ দিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করা হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও তা বাস্তবায়নে রাকসু নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যে দাবিগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এখন বলা হচ্ছে—এসব রাকসুর এখতিয়ারবহির্ভূত। যদি এখতিয়ারের মধ্যে না থাকে, তাহলে ইশতেহারে কেন দেওয়া হয়েছিল?’
আবাসন ও খাবারের মানসহ মৌলিক অধিকার নিয়ে আগে থেকেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিল দাবি করে মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, ‘আমরা ক্যাম্পাসে আবাসন ও খাবারের মানসহ মৌলিক অধিকার নিয়ে আগে থেকেই আন্দোলন করে আসছি। এসব দাবিকে তারা নিজেদের ইশতেহারে যুক্ত করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন-ক্যাম্পাস জব বা আবাসন ভাতার প্রতিশ্রুতিও তারা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের পরিবর্তে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য পুরোনো আশ্বাস আবার সামনে আনা হচ্ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রশাসন ও রাকসু দুটি পৃথক সত্তা। উভয়েই নিজ নিজ দায়িত্ব ও এখতিয়ারের মধ্যে কাজ করে। শতভাগ আবাসিকতা নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব তবে এটি স্বল্প সময়ে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।


