রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার দুই আসামির ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্ট করা হবে। একই সঙ্গে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং আসামিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে আসা তথ্য যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় ময়নাতদন্ত ও পুলিশের তদন্তে বেশ কিছু তথ্য সামনে এসেছে। নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তে দুইজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ সংগ্রহ এবং ডোপ টেস্ট করা হবে।
এ সময় হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার দুই আসামি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ এবং সাক্ষীদের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দির বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন পুলিশ কমিশনার।
পুলিশ কমিশনার বলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সীমান্ত দাস বলেছেন, তিনি একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করেন। আর সিদ্ধার্থ দাস স্বর্ণের দোকানের কারিগর হিসেবে কাজ করেন। গণপতি চক্রবর্তী স্যারের বাড়ির সঙ্গে সিদ্ধার্থদের বাড়ি লাগোয়া ছিল। গণপতি স্যার যে জমিতে বাড়ি করেছিলেন, সেটি আগে সিদ্ধার্থদের পূর্বপুরুষদের জমি ছিল। পরে গণপতি স্যার জমিটি কিনে বাড়ি করেন।
সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি আগে মাঝেমধ্যে উৎসবের সময় ইয়াবা সেবন করতেন। তবে ঘটনার আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার একটি করে ইয়াবা সেবন করতেন।
আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় সীমান্তের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধার্থের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর তিনি ইয়াবা নিয়ে মুগ্ধকে সঙ্গে করে সীমান্তদের বাসায় যান। সেখানে দুজন মিলে তিনটি ইয়াবা সেবন করেন।
রাত ৩টার দিকে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছা হলে তারা ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। রাত ৩টার পর সেখান থেকে বের হন। রাস্তায় কুকুর থাকায় তারা সরাসরি গেট দিয়ে না গিয়ে দেয়াল টপকে দেবুদের বাড়িতে প্রবেশ করেন।
দেবুদের বাড়ির ছাদে রেলিং নেই। তাই তারা ওই ছাদ থেকে গণপতি স্যারের বাড়ির ছাদে যান। দুই ছাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় দুই থেকে আড়াই ফুট। গণপতি স্যারের ছাদের চারপাশে হাফওয়াল ছিল। ফলে বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না।
সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, সেদিন তারা মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেন। এর আগে তারা একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবন করেছিলেন। মুগ্ধের জবানবন্দিতে অবশ্য সেদিন ৯টি ইয়াবা সেবনের কথা এসেছে। এটি ৮টি ও পরে আরও একটি ইয়াবা সেবনের হিসাব হতে পারে।
ভোরে গণপতি চক্রবর্তী স্যার ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাদের দেখে ফেলেন। তিনি তাদের ধমক দিয়ে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’ তখন তারা ভয় পেয়ে যায়। তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। তাদের আশঙ্কা ছিল, স্যার চিৎকার করবেন। এরপর তারা স্যারকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় বলে জবানবন্দিতে এসেছে।
সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ স্যারের গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেন। একপর্যায়ে স্যার মারা যান। পরে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে শ্বাসরোধজনিত মৃত্যুর বিষয়টি উঠে আসে। তাদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে ময়নাতদন্তের ওই তথ্যের মিল পাওয়া গেছে।
স্যারের মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখার সময় সম্ভবত শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে আসেন। তারা চিৎকার শুরু করেন। তখন মুগ্ধ স্যারের স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন। আর সিদ্ধার্থ স্যারের মেয়ের গলা চেপে ধরেন।
একপর্যায়ে স্যারের স্ত্রীর গলায় থাকা গামছা দিয়েই মেয়েটির গলায় প্যাঁচ দেওয়া হয়। পরে পাশের কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি নিয়ে মেয়েটির গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেওয়া হয়। এভাবে মা ও মেয়েকেও হত্যা করা হয়।
এরপর বাড়িতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না, সেই আশঙ্কা থেকে তারা নিচতলায় যান। সেখানে একটি পুরোনো প্লাস পান। সেটি দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন, যাতে কোনো ক্যামেরা থাকলেও সেটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
পরে তারা আবার ছাদে যান। মা ও মেয়ের মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির দিকে রেখে দেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, দেবুদের বাড়ির ছাদ থেকে যেন মরদেহ দেখা না যায়।
এরপর তারা স্যারের ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে দেখেন, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে গেছে। শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনতে পারে এবং বলে, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’


