...|...|...

সারাদেশ

ভোলায় লোকচক্ষুর আড়ালে ৩০০-৪০০ বছরের পুরনো মসজিদ

জি এম ছানাউল্লাহ, স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:১১
Shares
ভোলায় লোকচক্ষুর আড়ালে ৩০০-৪০০ বছরের পুরনো মসজিদ

দ্বীপজেলা সন্ধান মিলেছে ৩০০ থেকে ৪০০ বছরের পুরনো মসজিদের। ছবি: নিজস্ব

দ্বীপজেলা ভোলার সুপারি বাগানে সন্ধান মিলেছে ৩০০ থেকে ৪০০ বছরের পুরনো এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদের। চুন-সুরকির গাঁথুনি ও মুঘল স্থাপত্যশৈলীর ছাপযুক্ত প্রাচীন এ স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। সম্প্রতি মসজিদটির অস্তিত্ব জানার পর সরেজমিন পরিদর্শন করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে স্থাপনাটির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের বিষয়টি উঠে এসেছে। নির্মাণকাল ও ইতিহাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি মসজিদটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এখনো অজানা রয়ে গেছে এর প্রকৃত নির্মাণকাল, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠার ইতিহাস।

ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাংলাবাজার এলাকার মোইজুদ্দিন মাঝি বাড়ির সুপারি বাগানে অবস্থিত মসজিদটি। স্থানীয়দের কাছে এটি নেগাবান মসজিদ, টনির মসজিদ ও মাঝি বাড়ির মসজিদ নামে পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মসজিদটির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের নজরে আসে। অধিদফতরের চার সদস্যের একটি দল মসজিদটি সরেজমিন পরিদর্শন করে।

পরিদর্শনে দেখা যায়, বর্গাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মিত মসজিদটির দেয়াল চুন-সুরকির গাঁথুনিতে তৈরি। ছাদে রয়েছে অর্ধগোলাকার একটি গম্বুজ। স্থাপনাটির দৈর্ঘ্য ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি, প্রস্থ ১৯ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় আড়াই ফুট। সম্মুখ দেয়ালের নকশা ও নির্মাণশৈলীতে মুঘল স্থাপত্যরীতির ছাপ রয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হচ্ছে, মসজিদটি মুঘল আমলের শেষভাগ কিংবা ১৭ শতকের শেষভাগ থেকে ১৮ শতকের শুরুর দিকে নির্মিত হতে পারে। নবাব মুর্শিদ কুলি খানের আমলে এ অঞ্চলে মুসলিম জনবসতি গড়ে ওঠা ও ইসলাম প্রচারের ধারাবাহিকতায় মসজিদটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো ঐতিহাসিক দলিল এখনো পাওয়া যায়নি।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের পরিদর্শন দলের পর্যবেক্ষণে মসজিদটির ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, স্থাপত্যগত ও নান্দনিক গুরুত্ব রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। স্থাপনাটির নির্মাণকাল নিরূপণ, সংরক্ষণ উপযোগিতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর সংরক্ষণের প্রস্তাব পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রাচীন এ মসজিদটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে ভোলার ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিতি পাবে। ইতোমধ্যে অনেক দর্শনার্থী এখানে এসেছেন। কিন্তু যাতায়াতের রাস্তা খারাপ হওয়ায় তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ঐতিহাসিক স্থাপনাটির গুরুত্ব বিবেচনায় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। রাস্তার উন্নয়ন হলে দর্শনার্থীদের যাতায়াত সহজ হবে এবং মসজিদটি সংরক্ষণে বিভিন্ন সংস্থাও আগ্রহী হতে পারে।

মসজিদ-সংলগ্ন বাড়ির এক বাসিন্দা বলেন, অনেকেই প্রাচীন এ স্থাপনা দেখতে এসে সংরক্ষণের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু এখনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। সরকারিভাবে মসজিদটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে ভোলার ঐতিহ্য দেশ-বিদেশে তুলে ধরা সম্ভব হবে। একই সাথে মসজিদে যাওয়ার রাস্তাটি সংস্কারেরও দাবি জানান তিনি।

এদিকে দ্বীপজেলা ভোলায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় এখন পর্যন্ত কোনো নিদর্শন নেই। ফলে প্রাচীন এ মসজিদটি সংরক্ষণের আওতায় এলে জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে যুক্ত হবে নতুন এক অধ্যায়।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও সরকারি উদ্যোগে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটি সংরক্ষণ করা হবে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ভোলার প্রাচীন জনপদ, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশৈলীর ইতিহাস তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হবে।