ভোরের আলো ফুটতেই আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে শুরু হয় তাদের ছুটে চলা। কারও মাথায় ঝুড়ি, কারও কাঁধে কাপড় প্যাঁচানো পাতা-ভর্তি ব্যাগ। সারি সারি সবুজ চা-গাছের ফাঁকে ফাঁকে তখন ব্যস্ত হয়ে ওঠেন নারী-পুরুষ শ্রমিকেরা।
দুপুর গড়ালে সেই সবুজের মাঝেই বের হয় আরেক ছবি। গাছের ছায় বসে মুড়ি, পান্তা আর আটার মোটা রুটি। রুটির সাথে থাকে চা-পাতা দিয়ে তৈরি ভর্তা - শ্রমিকদের ভাষায় পাতিচখা। যে পাতা দেশের অর্থনীতিতে যোগ করে মূল্য, সেই পাতাই এখন অনেক শ্রমিক পরিবারের ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ।
কানিহাটি বাগানের বাস্তব চিত্র:
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী শমশেরনগর ইউনিয়নের কানিহাটি চা বাগান। বৃহস্পতিবার ( ১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে দিকে পাতা ওজন করে গাড়িতে তোলার অপেক্ষায় ছিলেন শ্রমিকেরা। তখনই চোখে পড়ে তাদের দুপুরের খাবারের এই করুণ চিত্র।
চা বাগানের এক নারী শ্রমিক নিয়তী রানী বলেন, ঘরে চাল থাকে না, ডাল বা তরকারি তো বিলাসিতা। রুটি বানিয়ে নিই, আর চায়ের কুঁড়ি দিয়ে পাতিচখা বানিয়ে খাই। কখনো কাঁচা, কখনো ভেজে নেই। তাতেই দিন চলে যায়।
এই পাতিচখা শুধু খাবার নয়, এটি চা শ্রমিক পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার প্রতীক। অনেকে সাথে আনেন পান্তা ভাত, চাল ভাজা, মুড়ি। কাঁচা মরিচ, রসুন ও পেঁয়াজ মিশিয়ে তৈরি ঝালও কারও কারও দুপুরের একমাত্র ভরসা।
পরিশ্রম আর অনিশ্চয়তার ১৭৮ টাকা:
শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সপ্তাহে ছয় দিনই তাদের কাজ করতে হয়। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাগানে কাজ। ঘরে ফিরে আবার রান্না, পানি সংগ্রহ, সন্তানদের দেখাশোনা।
একজন নারী শ্রমিক বলেন, সপ্তাহে ছয় দিন সকালে আটটায় কাজে ঢুকি, বিকেল পাঁচটায় ছুটি। ঘরে ফিরে আবার রান্না, পানি আনা, বাচ্চাদের দেখভাল-সব করতে হয়।
বাগান দূরে হলে ভোরের আগেই ঘর থেকে বের হতে হয়। অনেক শ্রমিক কয়েক কিলোমিটার হেঁটে আসেন। দিনের শেষে হাতে আসে প্রায় ১৭৮ টাকা। নির্ধারিত পরিমাণ পাতা তুলতে না পারলে মজুরি আরও কমে যায়। তাই খাবার, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা - সব কিছুর হিসাব কষতে হয় প্রতিদিন।
সবুজের আড়ালে জরাজীর্ণ জীবন:
মৌলভীবাজারে রয়েছে ৯২টি চা-বাগান। দেশের চা উৎপাদনের বড় অংশ আসে এখান থেকে। কিন্তু চা-বাগানের সবুজ সৌন্দর্যের আড়ালে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা ভিন্ন।
শত বছরের চা শিল্পের প্রধান শক্তি হয়েও তাদের জীবনমান এখনো কাঙ্ক্ষিত নয়। বসতঘর পুরোনো ও জরাজীর্ণ। স্যানিটেশন দুর্বল। স্বাস্থ্যসেবা সীমিত। স্কুল থাকলেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও সংকটের সঙ্গে লড়াই করছেন।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুঁকে কাজ করতে হয়। গরম, বৃষ্টি, কাদা - কিছুই থামায় না। শ্রমিকরা বলেন, দীর্ঘসময় কাজে পা ফুলে যায়, হাতে কড়া পড়ে, চামড়া উঠে যায়। তবু একদিন কাজ বন্ধ মানেই একদিনের আয় কম।
প্রশাসন কী বলছে:
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ তালুকদার জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে চা শ্রমিকদের পাশে থাকার চেষ্টা করা হচ্ছে। কেউ অসুস্থ হলে খোঁজ নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। কমলগঞ্জ উপজেলার ১২ হাজার ৫৯২ জন চা শ্রমিকের মাঝে প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। এটি বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে চা শ্রমিকরা বর্ধিত অর্থ পাবেন।
পাতিচখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাতিচখা মূলত যারা চা-পাতা তোলার কাজ করেন, তারাই খেয়ে থাকেন। বাড়িতে যারা থাকেন, তারা এটি খান কি না, তা আমার জানা নেই।
চা-বাগানে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, চা-বাগানে পাতা তোলার কাজে শ্রমিকদের স্যানিটেশনের প্রয়োজন হয়, কিন্তু অনেক জায়গায় সেটি নেই। পাশাপাশি চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পুষ্টির বিষয়েও বাগান ব্যবস্থাপকদের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।
তিনি আরও বলেন, চা শ্রমিকরা খুব কষ্টে জীবনযাপন করেন। তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকার কাজ করছে।


