হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে ইরান যেসব জাহাজ বাজেয়াপ্ত করার হুমকি দিয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশ জাহাজই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় ইতোমধ্যে হামলার শিকার হয়েছে—এএফপির এক ডেটা বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সংবাদ সংস্থা এনডিটিভির বরাতে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার ক্ষেত্রে ইরানি প্রোটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগে ভারতভিত্তিক সত্ত্বা দ্বারা মালিকানাধীন ও পরিচালিত অন্তত একটি জাহাজের চলাচল সীমিত করেছে ইরান। পারস্য উপসাগরীয় প্রণালী কর্তৃপক্ষের তৈরি করা ৪৫টি বিধি লঙ্ঘনকারী জাহাজের কালোতালিকায় যুক্ত করা হয়েছে বাল্ক ক্যারিয়ার ‘মহা রুস’-এর নাম।
মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত রেকর্ডপত্রের বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, সরাসরি ভারতের সাথে যুক্ত জাহাজগুলো ছাড়াও কালোতালিকাভুক্ত অন্যান্য জাহাজের একটি বড় অংশের অতীতে ভারতে কার্গো বা বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহের ইতিহাস রয়েছে।
সামুদ্রিক রেকর্ডগুলো আরও দেখায় যে, তালিকার বেশিরভাগ জাহাজই সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত। এছাড়া কাতার, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া, মাল্টা এবং সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশের সাথেও কিছু জাহাজের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এমনকি ‘মর্দন’ নামের একটি পাকিস্তানি পতাকাবাহী ক্রুড অয়েল ট্যাংকারও এই কালোতালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে পারস্য উপসাগরীয় প্রণালী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের ক্ষেত্রে কিছু জাহাজের পক্ষ থেকে ইরানি ব্যবস্থা লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে এই জলপথ দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ চলাচলের ওপর জরিমানা, আটক বা বাজেয়াপ্ত করার মতো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
ইরানি সংস্থাটি আরও সতর্ক করে বলেছে, কালোতালিকাভুক্ত জাহাজগুলোর সাথে সহযোগিতা করে এমন যেকোনো জাহাজকেও এই তালিকায় যুক্ত করা হবে।
সংস্থাটি যোগ করেছে, তালিকা থেকে নাম অপসারণের জন্য জাহাজগুলোকে উপযুক্ত কারণসহ পিজিএসএ-এর কাছে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিতে হবে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই তেহরান কৌশলগত এই চোকপয়েন্ট বা জলপথের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নিজেদের শিপিং করিডোর বা নৌপথ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে এই জলপথ উন্মুক্ত ছিল এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন দ্বারা পরিচালিত হতো। তবে সব জাহাজ এই জলপথের উত্তরাংশে অবস্থিত ইরানি-অনুমোদিত রুট দিয়ে চলাচল করছে না।
এএফপির একটি ডেটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালীর ট্রানজিট নিয়ম ভঙ্গের কারণে ইরান যেসব জাহাজ বাজেয়াপ্ত করার হুমকি দিয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশ জাহাজই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় ইতিমধ্যে হামলার শিকার হয়েছে।
তালিকায় থাকা ৪৫টি জাহাজের মধ্যে অন্তত ১৪টি জাহাজ প্রণালীর ভেতরে বা এর আশেপাশে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনায় ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা কর্তৃক নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই সমস্ত ঘটনাই ব্রিটেনের মেরিটাইম সিকিউরিটি এজেন্সি-র পক্ষ থেকে আক্রমণ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে, যদিও কে বা কারা এর জন্য দায়ী ছিল তা তারা নির্দিষ্ট করে জানায়নি।
এগুলোর প্রায় সবই সংঘটিত হয়েছে ওমানের উপকূলের কাছে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত এবং ইরানের নিষিদ্ধ করা একটি রুটের পাশ দিয়ে।
সামুদ্রিক ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম কেপলার-এর ডেটার ওপর এএফপির একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ইরানের তালিকার সিংহভাগ জাহাজই (৩৯টি) হলো এমন পণ্যবাহী ক্যারিয়ার, যেগুলো গত মার্চের পর থেকে অন্তত একবার এই প্রণালী পার হয়েছে।
কেপলারের ডেটা অনুযায়ী, এর মধ্যে কিছু জাহাজ ১২ বার পর্যন্ত এই প্রণালী অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ট্যাংকার ‘আল বাহ্যাহ’, যার একজন ক্রু সদস্য গত জুলাইয়ে এক হামলায় নিহত হয়েছিলেন।
একই সময়ের মধ্যে কেপলার কর্তৃক রেকর্ড করা এই পণ্যবাহী ক্যারিয়ারগুলোর ১৭০টিরও বেশি সমুদ্রযাত্রার মধ্যে ৭৫টির পরবর্তী গন্তব্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোনো একটি বন্দর এবং প্রায় ৭০টি জাহাজ সেখান থেকেই তাদের শেষ লোডিং স্টপ সম্পন্ন করেছিল।
এছাড়া কেপলারের ডেটা অনুযায়ী, ইরানের তালিকার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জাহাজের মালিকানা আমিরাতি কোম্পানিগুলোর হাতে রয়েছে।


