...|...|...

লাইফস্টাইল

বেশি আলু খেলে কি সত্যিই গ্যাসের সমস্যা হয়? জেনে নিন বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ভোর রাত ৫:০১ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১:১০
Shares
বেশি আলু খেলে কি সত্যিই গ্যাসের সমস্যা হয়? জেনে নিন বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

ছবি: সংগৃহীত

ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিপস, কড়াইশুঁটি দিয়ে আলুর দম কিংবা গরম গরম আলুর পরোটা—বাঙালি তথা বিশ্বজুড়ে মানুষের খাদ্যতালিকায় আলুর জনপ্রিয়তা শীর্ষে। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই এই প্রিয় খাবারটি খাওয়ার পর পেটে অস্বস্তি, পেট ফাঁপা বা গ্যাসের মতো সমস্যা দেখা দেয়। 

বিশেষ করে অতিরিক্ত আলু সেদ্ধ বা ভাজা খাওয়ার পর পেট অস্বাভাবিক ফুলে যাওয়ার অভিযোগ করেন অনেকেই। এখন প্রশ্ন হলো, বেশি আলু খেলে কি সত্যিই গ্যাসের সমস্যা হয়?

আলু ও গ্যাসের সম্পর্ক: বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

প্রবীণ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. অরুল প্রকাশ জানান, এই প্রশ্নের উত্তর শুধু 'হ্যাঁ' বা 'না'-তে দেওয়া সম্ভব নয়। সাধারণত যেসব খাবার খেলে মানুষের সবচেয়ে বেশি গ্যাস হয়, আলু সেই তালিকায় নেই। তবে অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কারো কারো পেটে অস্বস্তি বা গ্যাস হতে পারে। এর প্রভাব একেক জনের শরীরে একেক রকম হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পেটের এই সমস্যার জন্য কেবল আলু দায়ী নয়; বরং আলু কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, কতটুকু খাওয়া হচ্ছে এবং ওই ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা কেমন—তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। ভাত বা আলুর মতো স্টার্চ বা শ্বেতসারযুক্ত খাবারের প্রতি অনেকের শরীর সংবেদনশীল হতে পারে।

যেভাবে গ্যাস তৈরি হয়

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজ (এনআইডিডিকে)-র তথ্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্রান্ত্রে পুরোপুরি হজম না হওয়া কার্বোহাইড্রেট যখন বৃহদান্ত্রে পৌঁছায়, তখন সেখানে থাকা ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে গাঁজন (ফার্মেন্টেশন) প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন, মিথেন ও কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো গ্যাস উৎপন্ন হয়। গাঁজন বেশি হলে পেট ফাঁপা ও অস্বস্তি বাড়ে।

আলুর স্টার্চের একটি বড় অংশ ক্ষুদ্রান্ত্রে হজম হলেও কিছু অংশ তা এড়িয়ে বৃহদান্ত্রে চলে যায়। 'নিউট্রিশন অ্যান্ড গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি জার্নাল'-এর গবেষণা বলছে, এই প্রতিরোধী স্টার্চ (রেজিস্টেন্স স্টার্চ) অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য প্রিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

তবে সাময়িকভাবে এটি শরীরে অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি করতে পারে। এছাড়া ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মতো ভাজা আলুতে চর্বি (ফ্যাট) বেশি থাকায় তা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে এবং ব্লোটিং বা অস্বস্তি তৈরি করে।

আলুর বাইরেও যেসব খাবার গ্যাসের কারণ হতে পারে

ডা. অরুল প্রকাশের মতে, শুধু আলু নয়, মানুষের হজমক্ষমতা অনুযায়ী আরও অনেক পুষ্টিকর খাবারও গ্যাস ও পেট ফাঁপার কারণ হতে পারে:

  • ডাল ও শস্যদানা: বিনস, ছোলা, মটরশুঁটি ও মুসুর ডালে 'অলিগোস্যাকারাইড' নামক জটিল কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা ক্ষুদ্রান্ত্রে পুরোপুরি হজম না হয়ে বৃহদান্ত্রে গিয়ে গ্যাস তৈরি করে।
  • ক্রুসিফেরাস সবজি: যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) জানায়, ফুলকপি, ব্রোকলি ও বাঁধাকপিতে 'রাফিনোজ' নামের সালফারযুক্ত যৌগ থাকে, যা হজমের সময় প্রচুর গ্যাস তৈরি করতে পারে।
  • দুগ্ধজাত খাবার: দুধ, আইসক্রিম, পনির ও দইয়ে থাকা ল্যাকটোজ অনেকের শরীর হজম করতে পারে না (ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স)। ফলে গ্যাস, পেট ব্যথা বা ডায়রিয়া হতে পারে।
  • অতিরিক্ত ফাইবার ও সুগার-ফ্রি খাবার: খাবারে হঠাৎ ফাইবারের পরিমাণ বাড়ালে পাচনতন্ত্রে চাপ পড়ে। এছাড়া সুগার-ফ্রি চুইংগাম বা ক্যান্ডিতে ব্যবহৃত 'সুগার অ্যালকোহল' (যেমন সর্বিটল, ম্যানিটল) ক্ষুদ্রান্ত্রে আংশিক শোষিত হয়ে বৃহদান্ত্রে গ্যাস ও ডায়রিয়া তৈরি করে বলে মার্কিন মেয়ো ক্লিনিকের গবেষণায় দেখা গেছে।
  • কার্বোনেটেড পানীয়: সোডা বা কোমল পানীয় পেটে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস তৈরি করে, যার ফলে ঘন ঘন ঢেকুর ও পেট ফাঁপার সমস্যা হয়।

পেটের অস্বস্তি এড়ানোর উপায়

কার শরীরে কতটা গ্যাস তৈরি হবে তা মানুষের অন্ত্রের অণুজীবের গঠন (মাইক্রোবায়োটা), হজমের গতি ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভর করে। তবে কিছু সাধারণ পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব:

১. ধীরে চিবিয়ে খাওয়া: তাড়াহুড়ো করে খেলে খাবারের সাথে অতিরিক্ত বাতাস পেটে ঢুকে যায়। খাবার ভালো করে চিবিয়ে খেলে এই সমস্যা কমে।

২. খাবার আলাদা করে খাওয়া: যদি মুসুর ডাল ও আলু একসাথে খেয়ে সমস্যা হয়, তবে পরের বার এগুলো আলাদা আলাদা দিনে খেয়ে পরীক্ষা করুন। এতে ঠিক কোন খাবারে সমস্যা হচ্ছে তা বোঝা যাবে।

৩. রান্নার পদ্ধতি বদলানো: সমস্যা হলে খাবারের পরিমাণ কমানো বা রান্নার ধরন পরিবর্তন করা যেতে পারে।

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন? চিকিৎসকদের মতে, পেটে গ্যাস বা সামান্য ফোলাভাব সাধারণ বিষয়। তবে এই সমস্যার সাথে যদি আকস্মিক ওজন হ্রাস, ক্রমাগত তীব্র পেটে ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, মলে রক্তপাত, অতিরিক্ত কোষ্ঠকাঠিন্য বা ঘন ঘন বমি হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়, তবে তা মোটেও উপেক্ষা করা উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।