সন্তানকে শৃঙ্খলাবান করে তুলতে অনেক মা-বাবাই বকাঝকা কিংবা কঠোর শাসনের আশ্রয় নেন। তবে জাপানে শিশুদের আচরণ শেখানোর একটি প্রচলিত পদ্ধতি ‘শিৎসুকে’, যার মূল কথা হলো আত্মশৃঙ্খলা। এ পদ্ধতিতে শাস্তি বা রাগ দেখানোর পরিবর্তে শান্তভাবে বুঝিয়ে শিশুদের ভালো আচরণ, ধৈর্য ও শিষ্টাচার শেখানো হয়। শিশুর সামনে নিজে ভালো উদাহরণ তৈরি করা, নিয়মিত রুটিন বজায় রাখা এবং ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে নেওয়া এই তিনটি কৌশল সন্তানকে দায়িত্বশীল করে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডিজিটাল মিডিয়া ওয়েবসাইট আপওয়ার্দিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লেখিকা সেসিলি নোবলার জাপানি এই পদ্ধতি ও শিশু লালন-পালনের কৌশলগুলো তুলে ধরেছেন। নিবন্ধে বলা হয়েছে, শিশুর কোনো আচরণে সমস্যা দেখা দিলে শুধু তাকে শাসন না করে কেন এমন আচরণ করছে, তা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। সেই সাথে যে দক্ষতার অভাবে শিশুটি ভুল করছে, সেটি শেখানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
১. নিজে ভালো আচরণের উদাহরণ তৈরি করুন
শিশুরা বড়দের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং তা অনুকরণ করতে শেখে। জাপানি শিৎসুকে পদ্ধতিতেও মা-বাবার নিজেদের আচরণকে শিশুর জন্য আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সন্তানকে শান্ত, বিনয়ী ও সহনশীল দেখতে চাইলে আগে অভিভাবকদের নিজেদের আচরণে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
যেমন, সন্তান রেগে গিয়ে চিৎকার করলে তাকে শান্ত হতে বলার পাশাপাশি অভিভাবকদেরও রাগের সময় ধৈর্য ধরে কথা বলতে হবে। কারণ, বড়রা নিজেরাই যদি রাগের মাথায় চিৎকার করেন, তাহলে শিশুরা সেটিকে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে শিখতে পারে।
শিশু ভুল করলে সাথে সাথে বকাঝকা না করে ধৈর্য ধরার চেষ্টা করুন। পরিস্থিতি শান্ত হলে তাকে কাছে ডেকে আদর ও ভালোবাসার সাথে ভুলটি বুঝিয়ে বলুন। তার আচরণের কারণে কী সমস্যা হয়েছে, সেটিও ব্যাখ্যা করুন। প্রথমবারেই পরিবর্তন না এলেও নিয়মিত এমন আচরণ শিশুকে ধীরে ধীরে নিজের ভুল বুঝতে এবং তা সংশোধন করতে সাহায্য করতে পারে।
২. নিয়ম তৈরি করুন, ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন
শিশুর দৈনন্দিন জীবনে নির্দিষ্ট নিয়ম ও রুটিন থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কখন ঘুমাতে হবে, কখন খেতে হবে কিংবা কোন সময়ে মুঠোফোন ব্যবহার করা যাবে এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকলে শিশুর পক্ষে দৈনন্দিন কাজগুলো বুঝে নেওয়া সহজ হয়।
অনেক সময় মনে করা হয়, শিশুরা নিয়ম মানতে চায় না। কিন্তু নিয়মের অনুপস্থিতি তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। বিষয়টি বোঝার জন্য কর্মক্ষেত্রের উদাহরণ বিবেচনা করা যায়। কোনো কর্মী যদি না জানেন কখন অফিসে পৌঁছাতে হবে, তার দায়িত্ব কী কিংবা সভা কখন শুরু হবে, তাহলে তার মধ্যে বিভ্রান্তি ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রেও অনিশ্চিত পরিবেশ একই ধরনের অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
তাই পরিবারের দৈনন্দিন কাজের জন্য কিছু সহজ নিয়ম নির্ধারণ করুন। যেমন, রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, খাবার খাওয়ার সময় মুঠোফোন ব্যবহার না করা কিংবা খেলনা ব্যবহারের পর সেগুলো গুছিয়ে রাখা। তবে শুধু নিয়ম তৈরি করলেই হবে না, অভিভাবকদেরও তা ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করতে হবে। নিয়মগুলো আগে থেকে জানা থাকলে শিশু বুঝতে পারে তার কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এতে নিয়ম মেনে চলার অভ্যাসও গড়ে উঠতে পারে।
৩. ভুলকে শাস্তি নয়, শেখার সুযোগ হিসেবে নিন
শিশু কোনো ভুল করলে তাকে শুধু ‘এটা কোরো না’ বা ‘দুষ্টুমি বন্ধ করো’ বলার পরিবর্তে কেন সে এমন আচরণ করছে, তা বোঝার চেষ্টা করা দরকার। শিৎসুকে পদ্ধতিতে শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের পেছনে কোন দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, সেটি চিহ্নিত করে তাকে শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ধরুন, কোনো খেলনা বা পছন্দের জিনিস না পেয়ে সন্তান কান্নাকাটি করছে। এ ক্ষেত্রে সে হয়তো হতাশা সামলাতে শিখেনি। তাকে বকাঝকা না করে শান্ত হতে সাহায্য করুন। বলতে পারেন, ‘চলো, আমরা একটু শান্ত হই। তারপর কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়, তা নিয়ে কথা বলি।’
আবার একাধিক শিশু একই খেলনা নিয়ে খেলতে গিয়ে ঝগড়া করলে তাদের অপেক্ষা করা ও ভাগাভাগি করার অভ্যাস শেখানো যেতে পারে। যেমন, একজনকে বলা যায়, ‘এখন তোমার বন্ধুর পালা। এরপর তুমি খেলতে পারবে।’ এতে শিশু শুধু কী করা যাবে না, তা-ই শেখে না বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী কীভাবে আচরণ করতে হবে, সেটিও বুঝতে পারে।
এই পদ্ধতির লক্ষ্য হলো, শিশুর ভুলকে কেবল শাস্তি দেওয়ার কারণ হিসেবে না দেখে শেখার একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা। কোনো আচরণের পেছনে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব থাকলে তা শেখানোর মাধ্যমে শিশুকে ধীরে ধীরে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য ধারণ ও অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করা যায়।
শাস্তির চেয়ে আচরণ শেখানোয় গুরুত্ব
শিৎসুকে পদ্ধতির মূল ধারণা হলো, কোনো আচরণগত সমস্যা দেখা দেওয়ার পর শুধু তার প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে শুরু থেকেই শিশুকে প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখানো। অর্থাৎ, ভুলের জন্য বকাঝকা করার পাশাপাশি কেন ভুলটি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে তা এড়ানো যায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে


