ঝালকাঠির রাজাপুরে বিশখালী নদীর আকস্মিক ভাঙনে হুমকির মুখে পড়েছে ৬৫ নম্বর বাদুরতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদীর ভাঙনে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের চলাচলের একমাত্র সড়ক এবং বেড়িবাঁধের একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে জনচলাচল, পাশাপাশি ঝুঁকিতে পড়েছে বিদ্যালয় ভবন ও আশপাশের কৃষিজমি।
একই সাথে ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে প্রায় দেড়শ একর আমন ধানের জমিতে। ফলে বিদ্যালয় রক্ষা ও ফসল বাঁচানো-দুই দিক নিয়েই উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার পূর্ব বাদুরতলা এলাকায় বিশখালী নদীর তীরে হঠাৎ করে ভাঙন শুরু হয়। প্রথমে ভাঙনের তীব্রতা কম থাকলেও সময় বাড়ার সাথে সাথে তা ভয়াবহ আকার নেয়। একপর্যায়ে বেড়িবাঁধ, চলাচলের সড়ক ও ফসলি জমির একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
স্থানীয়দের দাবি, ভাঙনে এরই মধ্যে প্রায় ১০০ শতক জমি নদীতে চলে গেছে।
ভাঙনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ৬৫ নম্বর বাদুরতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যোগাযোগ ব্যবস্থায়। শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের চলাচলের একমাত্র সড়কটি নদীর ভাঙনে বিলীন হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে এলাকাবাসী।
স্থানীয়রা জানান, সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় বিদ্যালয়ে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি দৈনন্দিন প্রয়োজনেও ভোগান্তিতে পড়ছেন বাসিন্দারা।
ভাঙন অব্যাহত থাকলে বিদ্যালয় ভবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। নদীর তীরবর্তী এলাকায় বিদ্যালয়ের অবস্থান হওয়ায় দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. শাওন মল্লিক বলেন, হঠাৎ করে নদীভাঙন শুরু হয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের চলাচলের একমাত্র সড়কটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ায় চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখন ভাঙন যেভাবে বাড়ছে, তাতে বিদ্যালয় ভবন নিয়েও আমরা উদ্বিগ্ন। দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধ করে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। আমরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের প্রত্যাশা করছি।
নদীভাঙনের কারণে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে কৃষকদের মধ্যে। ভাঙনের কবলে পড়া এলাকায় প্রায় দেড়শ একর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। এসব জমি রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বেড়িবাঁধের অংশ নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় এখন জোয়ারের পানি সরাসরি ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য, আমন ধান ঘরে তোলার আশায় তারা জমিতে শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়লে তলিয়ে যেতে পারে বিস্তীর্ণ এলাকার ধানখেত। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন তারা।
আমন চাষি মো. শাহেব আলী খান বলেন, অনেক কষ্ট ও খরচ করে আমরা আমন ধান চাষ করেছি। এখন ধান ভালো অবস্থায় আছে। কিন্তু নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় জোয়ারের পানি জমিতে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পানি ঢুকে গেলে পুরো ধানখেত তলিয়ে গিয়ে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এই এলাকায় প্রায় দেড়শ একর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। দ্রুত বাঁধ মেরামত করে পানি প্রবেশ বন্ধ না করলে কৃষকদের পথে বসতে হবে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।
স্থানীয় মনির মাঝি বলেন, বিশখালী নদীর ভাঙন প্রতিবছরই আমাদের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এবার হঠাৎ করে বাঁধ ও সড়ক ভেঙে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে স্কুলের শিক্ষার্থীরা। ভাঙন এখনই ঠেকানো না গেলে সামনে আরও বড় ক্ষতি হবে। বিদ্যালয়, ফসলি জমি ও বসতবাড়ি রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভাঙন দ্রুত প্রতিরোধ করা না গেলে নদী আরও ভেতরের দিকে প্রবেশ করতে পারে। এতে বিদ্যালয় ভবন, সড়ক, বেড়িবাঁধ ও আশপাশের বসতিসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে আমন মৌসুমে বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়লে ফসলের পাশাপাশি কৃষকদের অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। তাই দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
তাদের দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে দ্রুত ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ও সড়ক সংস্কার এবং বিদ্যালয় রক্ষায় টেকসই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি বলেন, পূর্ব বাদুরতলা এলাকায় বিশখালী নদীর ভাঙনের বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে ভাঙনকবলিত স্থান পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের সাথে সমন্বয় করে ফসলি জমির ক্ষতির বিষয়টিও দেখা হবে। বিদ্যালয় ও স্থানীয় মানুষের চলাচলের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাদের মতে, সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া গেলে রক্ষা করা সম্ভব হবে বিদ্যালয়, বন্ধ করা যাবে নদীর আগ্রাসন এবং বাঁচানো যাবে কৃষকের আমন ধান।


