...|...|...

জাতীয়

বাংলাদেশে তাপপ্রবাহে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি অপরিণত শিশুর জন্ম: গবেষণা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২ নভেম্বর ২০২৬, রাত ১০:৫৬ | আপডেট: ২ নভেম্বর ২০২৬, রাত ১১:০৯
Shares
বাংলাদেশে তাপপ্রবাহে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি অপরিণত শিশুর জন্ম: গবেষণা

ছবি: সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তীব্র তাপপ্রবাহ বাংলাদেশে অপরিণত শিশুজন্মের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলের ভয়াবহ গরমের সাথে দেশে অতিরিক্ত ৫ হাজার ৫১৫টি অপরিণত শিশুর জন্মের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। এর মধ্যে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ১ হাজার ৪৭৯টি শিশুর অপরিণত জন্ম হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের (জেডসিএ) নতুন এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সোমবার (২ নভেম্বর) প্রকাশিত গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত ও ফিলিপিন্সে তাপপ্রবাহের কারণে অপরিণত শিশুজন্মের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। তিন দেশের মধ্যে বাংলাদেশেই এ ধরনের জন্মের হার বৃদ্ধির হিসাব সবচেয়ে বেশি।

গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহের সাথে বাংলাদেশে অপরিণত শিশুজন্মের হার ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রতি এক হাজার জন্মে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৯টি বেশি শিশু নির্ধারিত সময়ের আগে জন্মেছে। অতিরিক্ত জন্মের প্রায় ৪৭ শতাংশ ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।

গবেষকেরা ১৯৯১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এপ্রিল মাসের গড় তাপমাত্রার সাথে ২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপমাত্রা তুলনা করে এই হিসাব করেছেন। পৃথক আরেকটি বিশ্লেষণে তারা দেখেছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা অতিরিক্ত না বাড়লে ওই মাসে বাংলাদেশে অন্তত ১ হাজার ৪৭৯টি অপরিণত শিশুজন্ম এড়ানো সম্ভব হতো।

তবে ৫ হাজার ৫১৫ ও ১ হাজার ৪৭৯- এই দুটি সংখ্যা আলাদা বিশ্লেষণের ফল। প্রথমটি ২০২৪ সালের তাপপ্রবাহের সাথে সম্পর্কিত অতিরিক্ত জন্মের হিসাব। দ্বিতীয়টি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তি তাপমাত্রার প্রভাব নির্দেশ করে। তাই সংখ্যা দুটি যোগ করার সুযোগ নেই।

ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০২৪ সালের এপ্রিলের মতো তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা প্রায় ৪৫ গুণ বেড়েছিল।

বিভাগভেদে তাপের প্রভাব

দেশের সব অঞ্চলে তাপপ্রবাহের প্রভাব একই রকম ছিল না। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে অতিরিক্ত অপরিণত শিশুজন্মের মোট সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে প্রতি এক হাজার জন্মে ঝুঁকি বৃদ্ধির হিসাবে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি দেখা গেছে ময়মনসিংহ বিভাগে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলে ময়মনসিংহের তাপমাত্রা ওই মাসের স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে ৩ দশমিক ৫৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। আট বিভাগের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই হার ছিল সর্বোচ্চ। এর প্রভাবে প্রতি এক হাজার জন্মে অতিরিক্ত ২৪টি অপরিণত শিশুর জন্মের হিসাব পাওয়া গেছে। বিপরীতে সিলেটে এই সংখ্যা ছিল ১৬, যা বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।

মোট অতিরিক্ত অপরিণত শিশুজন্মের সংখ্যায় ময়মনসিংহের অবস্থান ছিল ষষ্ঠ। গবেষণায় দেশের প্রতিটি বিভাগে অপরিণত শিশুজন্মের ঝুঁকি আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, শুধু জাতীয় গড় দিয়ে তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যগত প্রভাব বোঝা যথেষ্ট নয়। জনসংখ্যা বেশি হলে কোনো অঞ্চলে আক্রান্তের মোট সংখ্যা বেশি হতে পারে। আবার জনসংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও সেখানে ঝুঁকি বৃদ্ধির হার বেশি থাকতে পারে।

ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা

বৈশ্বিক উষ্ণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে তাপমাত্রার কারণে অপরিণত শিশুজন্মের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। জেডসিএর পূর্বাভাস বলছে, ২০৪১ থেকে ২০৬০ সালের মধ্যে একটি স্বাভাবিক এপ্রিল মাসেও দেশে প্রায় দেড় হাজার অতিরিক্ত অপরিণত শিশুর জন্ম হতে পারে।

১৯৮৫ থেকে ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসের গড় জলবায়ুর সাথে তুলনা করে এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, ওই সময়ে অতিরিক্ত অপরিণত শিশুজন্মের সংখ্যা ৬৩০ থেকে ২ হাজার ৯০০-এর মধ্যে থাকতে পারে। এতে এপ্রিল মাসের তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। মাঝারি ও উচ্চমাত্রার বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পরিস্থিতি ধরে এই হিসাব করা হয়েছে।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, ওই সময়ে অতিরিক্ত অপরিণত শিশুজন্মের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী। তবে এই প্রাক্কলনে ধরে নেওয়া হয়েছে, তাপের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় নতুন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এবং তাপমাত্রার সাথে অপরিণত জন্মের বর্তমান সম্পর্ক ভবিষ্যতেও অপরিবর্তিত থাকবে।

গর্ভবতী নারীদের ঝুঁকি কেন বেশি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, গর্ভধারণের ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে জীবিত শিশুর জন্ম হলে তাকে অপরিণত জন্ম বা প্রি-টার্ম বার্থ বলা হয়। বিশ্বজুড়ে নবজাতকের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এটি। নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক জটিলতা, স্নায়বিক বিকাশে সমস্যা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার আশঙ্কাও থাকে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরে স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি চাপ তৈরি হয়। অতিরিক্ত তাপমাত্রা এই চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তীব্র গরমে পানিশূন্যতা, গর্ভফুলে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং শরীরে প্রদাহের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব শারীরিক পরিবর্তন নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রসব শুরু হওয়ার ঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত।

এ ছাড়া দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতাজনিত রক্তস্বল্পতা, কায়িক শ্রম এবং গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকা কিংবা তাপ আটকে রাখে এমন নির্মাণসামগ্রী দিয়ে তৈরি বাড়িতে বসবাসের কারণেও গর্ভবতী নারীরা অতিরিক্ত গরমের সংস্পর্শে আসেন।

স্বাস্থ্যসেবায় তাপ থেকে সুরক্ষার উদ্যোগ জরুরি

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইউনিসেফের সহযোগিতায় শিশু ও গর্ভবতী নারীদের তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় জাতীয় নির্দেশিকা চালু করে। এতে অপরিণত শিশুজন্মের ঝুঁকির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে নিয়মিত মাতৃস্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে অতিরিক্ত গরম থেকে সুরক্ষার বিষয়টি এখনো পরিকল্পিতভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

গবেষকেরা গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবায় তাপপ্রবাহের ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য ও পরামর্শ যুক্ত করার সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতা, শীতল পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কবার্তা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

যেসব বিভাগে অতিরিক্ত অপরিণত শিশুজন্মের সংখ্যা বেশি, সেখানে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে মোট সংখ্যা কম হলেও ঝুঁকি বৃদ্ধির হার বেশি- এমন এলাকাগুলোকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলেছেন গবেষকেরা।

প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক ও জেডসিএর জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক ড. জোয়ান বেন্টলি-ম্যাককুন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম তাপপ্রবাহের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে এবং এর তীব্রতাও বাড়ছে। ফলে অপরিণত শিশুজন্মের ঝুঁকির পাশাপাশি শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে খুব কম। অথচ উচ্চ আয়ের ও বেশি নিঃসরণকারী দেশগুলোর তুলনায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট চরম আবহাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশকে বেশি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এসব দেশের অভিযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদও তুলনামূলক বেশি।

জোয়ান বেন্টলি-ম্যাককুনের মতে, গবেষণার প্রাক্কলন স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা কোথায় বাড়ানো প্রয়োজন, তা নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে। উন্নত গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা ও আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে এসব উদ্যোগ ঝুঁকির একটি অংশ কমাতে পারবে। ভবিষ্যতের ক্ষতি সীমিত করতে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।

জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড পাবলিক হেলথের পরিচালক অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবির গবেষণাটিকে বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, চরম তাপমাত্রা গর্ভবতী নারী ও নবজাতকের জন্য জরুরি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহের সাথে সম্পর্কিত ৫ হাজার ৫১৫টি অতিরিক্ত অপরিণত শিশুজন্মের হিসাব দেখিয়ে দেয়, মাতৃস্বাস্থ্যসেবার সাথে তাপ থেকে সুরক্ষার বিষয়টি যুক্ত করা কতটা প্রয়োজন।

অধ্যাপক ইকবাল কবির গর্ভকালীন সেবার মাধ্যমে তাপজনিত ঝুঁকি শনাক্ত, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ ও শীতল পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, মা ও নবজাতককে চরম তাপ থেকে সুরক্ষিত রাখতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, জলবায়ুনীতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস জলবায়ু পরিবর্তন, প্রকৃতি ও জ্বালানি খাতের রূপান্তর নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করে থাকে। সংস্থাটির মতে, নতুন এই গবেষণা তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের কোন কোন অঞ্চলে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করতে সহায়তা করবে।