তীব্র স্রোতে উত্তাল পদ্মা। এর মধ্যে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে রাজবাড়ীর ধাওয়াপাড়া ও পাবনার নাজিরগঞ্জ নৌপথে ফেরি চলাচল। ফলে বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও স্পিডবোটে পদ্মা পার হচ্ছেন যাত্রীরা। ফেরি বন্ধের সুযোগে ট্রলার ও স্পিডবোটের ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
তাদের অভিযোগ, বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ঝুঁকি নিয়েই নদী পার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল নদীতে ট্রলারে পারাপার নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন অনেকেই।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সূত্রে জানা যায়, ধাওয়াপাড়া-নাজিরগঞ্জ নৌরুটে ‘ক্যামেলিয়া’ ও ‘কপোতী’ নামে দুটি ফেরি চলাচল করে। যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকসহ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০টি যানবাহন ধাওয়াপাড়া ঘাট থেকে নাজিরগঞ্জের উদ্দেশ্যে পারাপার হয়। নাজিরগঞ্জ থেকে রাজবাড়ীর দিকে আসা যানবাহনের সংখ্যা আরও বেশি।
গত ২৩ জুলাই থেকে ‘কপোতী’ ফেরিটি বন্ধ রয়েছে। এরপর তীব্র স্রোতের বিপরীতে চলতে না পারায় গত ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে ‘ক্যামেলিয়া’ ফেরিটির চলাচলও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় এ নৌপথ ব্যবহারকারী যানবাহনগুলোকে এখন কুষ্টিয়ার লালন শাহ সেতু হয়ে ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজবাড়ী শহরের নতুন বাজার থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে ধাওয়াপাড়া ঘাট। ঘাটের পন্টুনের সাথে মোটা রশি দিয়ে বাঁধা রয়েছে ‘ক্যামেলিয়া’ ফেরিটি। অন্যদিকে ঘাটে স্পিডবোট ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে।
নাজিরগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে যাত্রীদের পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও কিছু পণ্যও পরিবহন করতে দেখা যায়। স্পিডবোটে থাকা কয়েকজন যাত্রীর শরীরে লাইফ জ্যাকেট থাকলেও ট্রলারে থাকা কোনো যাত্রীর শরীরে লাইফ জ্যাকেট দেখা যায়নি।
ট্রলারের সামনেই কাঠের টেবিল বসিয়ে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। সেখানে ছাপানো টিকিটে ট্রলার ভাড়া ৮০ টাকা এবং স্পিডবোটের ভাড়া ১৫০ টাকা লেখা রয়েছে। একটি মোটরসাইকেল পারাপারে নেওয়া হচ্ছে ২০০ টাকা।
অপেক্ষমাণ যাত্রীরা জানান, ফেরি চলাচল স্বাভাবিক থাকলে একজন যাত্রীর ভাড়া ছিল ৩০ টাকা। ট্রলারে ৫০ টাকা এবং স্পিডবোটে ১০০ টাকা নেওয়া হতো। কিন্তু ফেরি বন্ধের পর ট্রলারে ৮০ টাকা ও স্পিডবোটে ১৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। মোটরসাইকেল পারাপারে নেওয়া হচ্ছে ২০০ টাকা। এর সাথে ট্রলারে ওঠার জন্য আরও পাঁচ টাকা দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
উজ্জল রায় নামে এক যাত্রী বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগে এই ঘাট দিয়েই রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আজ বাড়িতে ফিরছি। কিন্তু ফেরি বন্ধ থাকায় ট্রলারে করে যেতে হচ্ছে। আজ ভাড়া নিয়েছে ৮০ টাকা, এর সাথে ঘাট বাবদ আরও ৫ টাকা দিতে হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে ট্রলারে ভাড়া নেয় ৫০ টাকা। ফেরি চালু থাকলে এর অর্ধেক খরচে যাতায়াত করা যেত। এত ভোগান্তিও পোহাতে হতো না।’
হাসেন মন্ডল নামে আরেক যাত্রী বলেন, ‘ওপার থেকে ৫০ টাকা দিয়ে এসেছি। এখন যেতে ৮০ টাকা লাগছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ভাড়া বাড়ছে। এগুলো দেখার কেউ নেই।’
স্নেহা নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ফেরি বন্ধ থাকায় ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ট্রলারে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এভাবে নদী পারাপার করা আমাদের জন্য অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। ফেরিতে যাতায়াত অনেক নিরাপদ। এই রুটে ভালো মানের ফেরি দেওয়ার দাবি জানাই।
অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে ট্রলার ও স্পিডবোটের চালকদের সাথে কথা হলে তারা জানান, নদীতে স্রোত বেশি থাকায় পার হতে সময় বেশি লাগছে। এতে জ্বালানি খরচও বাড়ছে। পাশাপাশি বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া কিছুটা বাড়ানো হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসি ধাওয়াপাড়া ফেরিঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক রবিউল ইসলাম বলেন, এই নৌরুটে দুটি ফেরি চলাচল করে। দিনে চারবার পাবনার নাজিরগঞ্জের উদ্দেশ্যে ফেরি ছেড়ে যেত। বর্তমানে তীব্র স্রোতের কারণে ফেরির ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে। এভাবে ফেরি চালালে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই নিরাপত্তার কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ফেরি বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়েছেন ট্রলার ও স্পিডবোটের চালকেরা। তবে এগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। যত দ্রুত সম্ভব ফেরি চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে।


