সকালের নাস্তায় ডিম একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় খাবার। এটি তৈরি করা সহজ, প্রোটিনে ভরপুর এবং সুস্বাদু। কিন্তু ডিমের কুসুমে থাকা কোলেস্টেরল এবং হৃদরোগের ঝুঁকির কথা ভেবে অনেকেই প্রতিদিন ডিম খেতে দ্বিধা করেন। কেউ কেউ শুধু সাদা অংশ খান, আবার কেউ পেশি তৈরির জন্য একাধিক ডিম খান। তাহলে সঠিক ভারসাম্যটি কী ?প্রতিদিন ডিম খাওয়া কি নিরাপদ? হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের -এর অধীনে পরিচালিত এক গবেষণায় এসব এসব প্রশ্নের উত্তর উঠে এসেছে।
ডিমের পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা
ডিমকে প্রকৃতির অন্যতম 'সুপারফুড' বলা যেতে পারে। এটি উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি বেশ কিছু অপরিহার্য পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ।
ভিটামিন ও খনিজ: ডিমে ভিটামিন বি১২, সেলেনিয়াম এবং কোলিন থাকে।
চোখের স্বাস্থ্য: কুসুমে লুটেইন এবং জিয়াজ্যান্থিন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
তবে ডিমকে একক খাবার হিসেবে না দেখে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের নির্দেশিকাতেও কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবারের চেয়ে সামগ্রিকভাবে হৃদ-স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
গবেষণা কী বলে?
ডিম খাওয়ার প্রভাব নিয়ে করা গবেষণাগুলোর ফলাফল সবসময় একরকম নয়।
দুর্বল প্রমাণ: ২০২৫ সালের এক গবেষণায় পূর্বের ১৪টি মেটা-অ্যানালাইসিস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ডিম খাওয়ার সাথে স্বাস্থ্যের ভালো বা খারাপ ফলাফলের সরাসরি সংযোগকারী প্রমাণগুলো বেশ দুর্বল এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
মৃত্যুর ঝুঁকি: ২০২২ সালের অন্য একটি বড় পর্যালোচনায় প্রতিদিন ডিম খাওয়ার সংখ্যার সাথে যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকির সামান্য বৃদ্ধির একটি সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, এই সম্পর্কটি ডিমের কারণেই হয়েছে-এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
দিনে কয়টি ডিম খাওয়া যাবে?
‘দিনে কয়টি ডিম খেতে পারবেন, তার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই যা সবার জন্য উপযুক্ত।’ এটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক: একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি দিনে ১টি গোটা ডিম দিয়ে শুরু করতে পারেন।
শারীরিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তি: যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা যাদের প্রোটিনের চাহিদা বেশি, তাদের খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে এই সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে।
সার্বজনীন সুপারিশ হিসাবে প্রতিদিন একাধিক ডিম খাওয়া সমীচীন নয়, যতক্ষণ না আপনার পুষ্টি চাহিদা বা স্বাস্থ্য অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হচ্ছেন।
ডিম ও কোলেস্টেরল বিতর্ক
ডিমের কুসুমে ডায়েটারি কোলেস্টেরল থাকে, যা নিয়ে অনেকের উদ্বেগ রয়েছে। তবে মনে রাখা জরুরি: ডায়েটারি কোলেস্টেরল আর ব্লাড কোলেস্টেরল (রক্তের কোলেস্টেরল) এক নয়।
খাবারের কোলেস্টেরল রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রার ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। জিনগত কারণ, স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ এবং ব্যক্তির বর্তমান কোলেস্টেরলের মাত্রা এতে ভূমিকা রাখে।
২০২৫ সালের একটি রিভিউতে ডিম খাওয়া এবং উচ্চ এলডিএল (খারাপ) কোলেস্টেরলের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেলেও, গবেষকরা এই প্রমাণটিকে অত্যন্ত দুর্বল বলে আখ্যা দিয়েছেন। এর মানে হলো, প্রতিদিন ডিম খেলেই সবার কোলেস্টেরল বাড়বে-এমনটি ঠিক নয়।
পুরো ডিম নাকি শুধু সাদা অংশ?
সাদা অংশ: এটি প্রোটিনের একটি কম চর্বিযুক্ত উৎস এবং এতে কোনো কোলেস্টেরল নেই। যারা ক্যালোরি এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রেখে উচ্চ প্রোটিন চান, তাদের জন্য এটি ভালো।
পুরো ডিম: কুসুমে প্রোটিনের পাশাপাশি ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিন, খনিজ, কোলিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকে।
একটি সুষম খাদ্য পরিকল্পনায় যেকোনোটিই যোগ করা যেতে পারে। আপনার খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে সঠিক বিকল্পটি বেছে নিন। প্রয়োজনে পুরো ডিমের সাথে অতিরিক্ত সাদা অংশ যোগ করে প্রোটিনের ভারসাম্য বজায় রাখা যেতে পারে।
কারা সতর্ক থাকবেন?
যাদের নির্দিষ্ট কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তাদের প্রতিদিন ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে এবং ব্যক্তিগত পরামর্শ নিতে হবে।
হৃদরোগী: যাদের উচ্চ এলডিএল কোলেস্টেরল, বংশগত হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়া বা আগে থেকেই হৃদরোগ রয়েছে, তাদের ডিম খাওয়ার পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডায়াবেটিস: ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি নির্দিষ্ট খাবারের ওপর মনোযোগ না দিয়ে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ওপর মনোযোগ দেওয়া উচিত।
অ্যালার্জি: যাদের ডিমে অ্যালার্জি আছে, তাদের অবশ্যই ডিম এড়িয়ে চলতে হবে।


